শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিলেটে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প


হাসান জুলহাস:
প্রকাশিত: ২৩ মে ২০২৬, ০১:২৫ পিএম

সিলেটে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প

হাসান জুলহাস: বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। একসময় সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, কলস, থালা-বাটি, পুতুল ও খেলনার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও বর্তমানে প্লাস্টিক, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, মেলামাইন ও সিরামিক পণ্যের দাপটে সেই ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে।

একসময় গ্রামবাংলার কুমারপাড়াগুলো ছিল ব্যস্ততায় মুখর। ভোর হতেই মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল বোঝাই ভাঁড় নিয়ে বিক্রেতারা ছুটে যেতেন গ্রামগঞ্জে। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে গৃহস্থালির প্রায় সব কাজেই ব্যবহার হতো মাটির তৈরি তৈজসপত্র। ধান কাটার মৌসুমে কুমারদের ব্যস্ততা আরও বেড়ে যেত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্য এখন প্রায় অতীত।

মৃৎশিল্পীরা জানান, মাটির জিনিসপত্র স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব হলেও বাজারে আধুনিক ও টেকসই পণ্যের আধিপত্যে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে গেছে। পাশাপাশি কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন সংকট ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর জন্য।

মৃৎশিল্পী রাজকুমার বলেন, “পূর্বপুরুষদের দেখানো পথ ধরেই এখনও এ পেশায় আছি। কিন্তু এখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে গেছে। লাভ কম, খরচ বেশি। সরকার সহজ শর্তে ঋণ ও সহযোগিতা দিলে হয়তো টিকে থাকা সম্ভব হতো।”

মৃৎশিল্পী অন্ত পাল, নেপাল পাল ও সুবাশ পাল জানান, একসময় ৪০ থেকে ৫০ ধরনের মাটির পণ্য তৈরি হতো। হাঁড়ি-পাতিল, কলস, মটকি, পুতুল, খেলনাসহ নানা সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা ছিল। কিন্তু এখন চাহিদা কমে যাওয়ায় আগের মতো উৎপাদনও হয় না।

সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলায় এখনও কিছুটা হলেও মৃৎশিল্পের চর্চা রয়েছে। সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা ও বিশ্বনাথের বিভিন্ন গ্রামে এখনও কিছু পরিবার এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। মৌলভীবাজারের মনোহরকোনা ও সৈয়ারপুর এলাকায় একসময় গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ মৃৎশিল্প পল্লী। বর্তমানে সেখানে আগের সেই জৌলুস নেই। বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।

মৌলভীবাজারের মৃৎপণ্য বিক্রেতা অরবিন্দু পাল বলেন, “পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা এই ব্যবসা এখনও ধরে রেখেছি। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে শিল্পটি আজ সংকটে।” জেলা মৃৎশিল্পী প্রয়াত সন্তোষ পালের ছেলে সুজিত পাল বলেন, “আগে মাটির তৈরি জিনিসের ব্যাপক চাহিদা ছিল। এখন বিক্রি প্রায় বন্ধ। বাধ্য হয়ে ব্যবসা পরিবর্তন করতে হয়েছে।”

অন্যদিকে হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সুরাবই গ্রামের পালপাড়ায় এখনও প্রায় ২৫টি পরিবার মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে তাদের ব্যস্ততা কিছুটা বাড়ে। এ সময় হাঁড়ি-পাতিলের পাশাপাশি মাটির ব্যাংক, পুতুল, গরু-মহিষের খেলনা তৈরি করা হয়, যা বৈশাখী মেলায় বিক্রি হয়।

মৃৎশিল্পী অমিয় চন্দ্র পাল বলেন, “একসময় মৃৎশিল্পীদের অনেক কদর ছিল। এখন সেই কদর আর নেই। প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্যের কারণে মানুষ মাটির জিনিস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।”

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার শত্রুমর্দন কুমারপাড়াতেও একই চিত্র। একসময় বিখ্যাত এই গ্রামে এখন গুটিকয়েক পরিবার টিকিয়ে রেখেছেন বাপ-দাদার পেশা। মাটির জিনিসের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা বদল করছেন। কেউই চান না তাদের সন্তানরা এই অনিশ্চিত পেশায় আসুক।

মৃৎশিল্পী অধীর রুদ্র পাল বলেন, “মাটির জিনিস বানাতে অনেক খরচ হয়। কিন্তু বিক্রি কম। সরকার থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও মাসিক সহায়তা পেলে আমরা কাজ চালিয়ে যেতে পারতাম।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জাতীয় পরিষদের সদস্য আসম সালেহ সোহেল বলেন, “আধুনিক প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৃৎশিল্পকে আবারও জনপ্রিয় করা সম্ভব। এজন্য প্রশাসনের উদ্যোগ প্রয়োজন।”

লেখক ও গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন, “যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মাটির জিনিসপত্র তার ঐতিহ্য হারাচ্ছে। ফলে এ পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষের জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও তারা স্বপ্ন দেখেন—একদিন আবারও মাটির পণ্যের কদর বাড়বে।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। না হলে কালের আবর্তে হারিয়ে যাবে বাংলার হাজার বছরের এই শিল্প ঐতিহ্য।

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: /৫ ( ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

নগরীতে বাস্তবায়ন হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

নগরীতে বাস্তবায়ন হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

মহানগরীর মোগলাবাজার থানাধীন খালেরমুখ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ১০ হাজার ইয়াবাসহ ৩জন গ্রেফতার

মহানগরীর মোগলাবাজার থানাধীন খালেরমুখ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ১০ হাজার ইয়াবাসহ ৩জন গ্রেফতার

শাল্লার কান্দিগাঁও গ্রামের ঐতিহ্যবাহ নৌকা বাইচ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী

শাল্লার কান্দিগাঁও গ্রামের ঐতিহ্যবাহ নৌকা বাইচ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী

ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় দুই সেনাসদস্য নিহত

ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় দুই সেনাসদস্য নিহত

তালাশ টেলিভিশনে নারীকে শিকল পড়িয়ে হাটিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর তোলপাড়: কিশোরীকে নির্যাতনের ঘটনায় আটক ৩

তালাশ টেলিভিশনে নারীকে শিকল পড়িয়ে হাটিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর তোলপাড়: কিশোরীকে নির্যাতনের ঘটনায় আটক ৩

ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড শপিং সেন্টারে অগ্নিকাণ্ডস্থল পরিদর্শনে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ

ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড শপিং সেন্টারে অগ্নিকাণ্ডস্থল পরিদর্শনে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ

ইসিএ এলাকায় তাণ্ডবের বিরুদ্ধে অভিযান, ধ্বংস ১০ ড্রেজার ও ৬ এক্সকেভেটর

ইসিএ এলাকায় তাণ্ডবের বিরুদ্ধে অভিযান, ধ্বংস ১০ ড্রেজার ও ৬ এক্সকেভেটর

২১৭ কোটি টাকার রেল প্রকল্পে ধীরগতি, মেয়াদ শেষেও বাকি ৭৫ শতাংশ কাজ

২১৭ কোটি টাকার রেল প্রকল্পে ধীরগতি, মেয়াদ শেষেও বাকি ৭৫ শতাংশ কাজ

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান: শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে সেবা চালু

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান: শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে সেবা চালু

কনজিউমার রাইটস বাংলাদেশ-সিআরবি' সিলেট বিভাগীয় শাখার কার্যনির্বাহী কমিটির শপথ গ্রহণ

কনজিউমার রাইটস বাংলাদেশ-সিআরবি' সিলেট বিভাগীয় শাখার কার্যনির্বাহী কমিটির শপথ গ্রহণ

নগরীতে বাস্তবায়ন হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

নগরীতে বাস্তবায়ন হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

মহানগরীর মোগলাবাজার থানাধীন খালেরমুখ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ১০ হাজার ইয়াবাসহ ৩জন গ্রেফতার

মহানগরীর মোগলাবাজার থানাধীন খালেরমুখ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ১০ হাজার ইয়াবাসহ ৩জন গ্রেফতার

১৫ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির সিলেট সফর, প্রস্তুতিমূলক সভায় মন্ত্রীর নির্দেশনা

১৫ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির সিলেট সফর, প্রস্তুতিমূলক সভায় মন্ত্রীর নির্দেশনা

ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় দুই সেনাসদস্য নিহত

ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় দুই সেনাসদস্য নিহত

তালাশ টেলিভিশনে নারীকে শিকল পড়িয়ে হাটিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর তোলপাড়: কিশোরীকে নির্যাতনের ঘটনায় আটক ৩

তালাশ টেলিভিশনে নারীকে শিকল পড়িয়ে হাটিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর তোলপাড়: কিশোরীকে নির্যাতনের ঘটনায় আটক ৩

ইসিএ এলাকায় তাণ্ডবের বিরুদ্ধে অভিযান, ধ্বংস ১০ ড্রেজার ও ৬ এক্সকেভেটর

ইসিএ এলাকায় তাণ্ডবের বিরুদ্ধে অভিযান, ধ্বংস ১০ ড্রেজার ও ৬ এক্সকেভেটর

ভ্যান সরানো নিয়ে কথা-কাটাকাটি, পরে যুবককে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ

ভ্যান সরানো নিয়ে কথা-কাটাকাটি, পরে যুবককে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ

খাদিমনগরে সরকারি খাস জমিতে অ্যালুমিনিয়াম কারখানা স্থাপনের অভিযোগ

খাদিমনগরে সরকারি খাস জমিতে অ্যালুমিনিয়াম কারখানা স্থাপনের অভিযোগ

খাদিমনগরে খাস জমি দখলের অভিযোগ, পাহাড় কেটে গড়ে উঠছে প্লট

খাদিমনগরে খাস জমি দখলের অভিযোগ, পাহাড় কেটে গড়ে উঠছে প্লট

সিলেট সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৩৬ লাখ টাকার চোরাচালানি মালামাল জব্দ!

সিলেট সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৩৬ লাখ টাকার চোরাচালানি মালামাল জব্দ!

সিলেট এডিশন

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সিলেটে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প

প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬

featured Image

হাসান জুলহাস: বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। একসময় সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, কলস, থালা-বাটি, পুতুল ও খেলনার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও বর্তমানে প্লাস্টিক, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, মেলামাইন ও সিরামিক পণ্যের দাপটে সেই ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে।

একসময় গ্রামবাংলার কুমারপাড়াগুলো ছিল ব্যস্ততায় মুখর। ভোর হতেই মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল বোঝাই ভাঁড় নিয়ে বিক্রেতারা ছুটে যেতেন গ্রামগঞ্জে। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে গৃহস্থালির প্রায় সব কাজেই ব্যবহার হতো মাটির তৈরি তৈজসপত্র। ধান কাটার মৌসুমে কুমারদের ব্যস্ততা আরও বেড়ে যেত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্য এখন প্রায় অতীত।

মৃৎশিল্পীরা জানান, মাটির জিনিসপত্র স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব হলেও বাজারে আধুনিক ও টেকসই পণ্যের আধিপত্যে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে গেছে। পাশাপাশি কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন সংকট ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর জন্য।

মৃৎশিল্পী রাজকুমার বলেন, “পূর্বপুরুষদের দেখানো পথ ধরেই এখনও এ পেশায় আছি। কিন্তু এখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে গেছে। লাভ কম, খরচ বেশি। সরকার সহজ শর্তে ঋণ ও সহযোগিতা দিলে হয়তো টিকে থাকা সম্ভব হতো।”

মৃৎশিল্পী অন্ত পাল, নেপাল পাল ও সুবাশ পাল জানান, একসময় ৪০ থেকে ৫০ ধরনের মাটির পণ্য তৈরি হতো। হাঁড়ি-পাতিল, কলস, মটকি, পুতুল, খেলনাসহ নানা সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা ছিল। কিন্তু এখন চাহিদা কমে যাওয়ায় আগের মতো উৎপাদনও হয় না।

সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলায় এখনও কিছুটা হলেও মৃৎশিল্পের চর্চা রয়েছে। সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা ও বিশ্বনাথের বিভিন্ন গ্রামে এখনও কিছু পরিবার এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। মৌলভীবাজারের মনোহরকোনা ও সৈয়ারপুর এলাকায় একসময় গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ মৃৎশিল্প পল্লী। বর্তমানে সেখানে আগের সেই জৌলুস নেই। বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।

মৌলভীবাজারের মৃৎপণ্য বিক্রেতা অরবিন্দু পাল বলেন, “পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা এই ব্যবসা এখনও ধরে রেখেছি। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে শিল্পটি আজ সংকটে।” জেলা মৃৎশিল্পী প্রয়াত সন্তোষ পালের ছেলে সুজিত পাল বলেন, “আগে মাটির তৈরি জিনিসের ব্যাপক চাহিদা ছিল। এখন বিক্রি প্রায় বন্ধ। বাধ্য হয়ে ব্যবসা পরিবর্তন করতে হয়েছে।”

অন্যদিকে হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সুরাবই গ্রামের পালপাড়ায় এখনও প্রায় ২৫টি পরিবার মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে তাদের ব্যস্ততা কিছুটা বাড়ে। এ সময় হাঁড়ি-পাতিলের পাশাপাশি মাটির ব্যাংক, পুতুল, গরু-মহিষের খেলনা তৈরি করা হয়, যা বৈশাখী মেলায় বিক্রি হয়।

মৃৎশিল্পী অমিয় চন্দ্র পাল বলেন, “একসময় মৃৎশিল্পীদের অনেক কদর ছিল। এখন সেই কদর আর নেই। প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্যের কারণে মানুষ মাটির জিনিস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।”

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার শত্রুমর্দন কুমারপাড়াতেও একই চিত্র। একসময় বিখ্যাত এই গ্রামে এখন গুটিকয়েক পরিবার টিকিয়ে রেখেছেন বাপ-দাদার পেশা। মাটির জিনিসের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা বদল করছেন। কেউই চান না তাদের সন্তানরা এই অনিশ্চিত পেশায় আসুক।

মৃৎশিল্পী অধীর রুদ্র পাল বলেন, “মাটির জিনিস বানাতে অনেক খরচ হয়। কিন্তু বিক্রি কম। সরকার থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও মাসিক সহায়তা পেলে আমরা কাজ চালিয়ে যেতে পারতাম।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জাতীয় পরিষদের সদস্য আসম সালেহ সোহেল বলেন, “আধুনিক প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৃৎশিল্পকে আবারও জনপ্রিয় করা সম্ভব। এজন্য প্রশাসনের উদ্যোগ প্রয়োজন।”

লেখক ও গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন, “যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মাটির জিনিসপত্র তার ঐতিহ্য হারাচ্ছে। ফলে এ পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষের জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও তারা স্বপ্ন দেখেন—একদিন আবারও মাটির পণ্যের কদর বাড়বে।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। না হলে কালের আবর্তে হারিয়ে যাবে বাংলার হাজার বছরের এই শিল্প ঐতিহ্য।


সিলেট এডিশন

প্রকাশক ও সম্পাদক:
কামরুল হাসান জুলহাস

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
সিলেটে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প
0:00 / 0:00
1x