উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
হাসান জুলহাস: বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। একসময় সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, কলস, থালা-বাটি, পুতুল ও খেলনার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও বর্তমানে প্লাস্টিক, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, মেলামাইন ও সিরামিক পণ্যের দাপটে সেই ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে।
একসময় গ্রামবাংলার কুমারপাড়াগুলো ছিল ব্যস্ততায় মুখর। ভোর হতেই মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল বোঝাই ভাঁড় নিয়ে বিক্রেতারা ছুটে যেতেন গ্রামগঞ্জে। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে গৃহস্থালির প্রায় সব কাজেই ব্যবহার হতো মাটির তৈরি তৈজসপত্র। ধান কাটার মৌসুমে কুমারদের ব্যস্ততা আরও বেড়ে যেত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্য এখন প্রায় অতীত।
মৃৎশিল্পীরা জানান, মাটির জিনিসপত্র স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব হলেও বাজারে আধুনিক ও টেকসই পণ্যের আধিপত্যে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে গেছে। পাশাপাশি কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন সংকট ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর জন্য।
মৃৎশিল্পী রাজকুমার বলেন, “পূর্বপুরুষদের দেখানো পথ ধরেই এখনও এ পেশায় আছি। কিন্তু এখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে গেছে। লাভ কম, খরচ বেশি। সরকার সহজ শর্তে ঋণ ও সহযোগিতা দিলে হয়তো টিকে থাকা সম্ভব হতো।”
মৃৎশিল্পী অন্ত পাল, নেপাল পাল ও সুবাশ পাল জানান, একসময় ৪০ থেকে ৫০ ধরনের মাটির পণ্য তৈরি হতো। হাঁড়ি-পাতিল, কলস, মটকি, পুতুল, খেলনাসহ নানা সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা ছিল। কিন্তু এখন চাহিদা কমে যাওয়ায় আগের মতো উৎপাদনও হয় না।
সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলায় এখনও কিছুটা হলেও মৃৎশিল্পের চর্চা রয়েছে। সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা ও বিশ্বনাথের বিভিন্ন গ্রামে এখনও কিছু পরিবার এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। মৌলভীবাজারের মনোহরকোনা ও সৈয়ারপুর এলাকায় একসময় গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ মৃৎশিল্প পল্লী। বর্তমানে সেখানে আগের সেই জৌলুস নেই। বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
মৌলভীবাজারের মৃৎপণ্য বিক্রেতা অরবিন্দু পাল বলেন, “পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা এই ব্যবসা এখনও ধরে রেখেছি। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে শিল্পটি আজ সংকটে।” জেলা মৃৎশিল্পী প্রয়াত সন্তোষ পালের ছেলে সুজিত পাল বলেন, “আগে মাটির তৈরি জিনিসের ব্যাপক চাহিদা ছিল। এখন বিক্রি প্রায় বন্ধ। বাধ্য হয়ে ব্যবসা পরিবর্তন করতে হয়েছে।”
অন্যদিকে হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সুরাবই গ্রামের পালপাড়ায় এখনও প্রায় ২৫টি পরিবার মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে তাদের ব্যস্ততা কিছুটা বাড়ে। এ সময় হাঁড়ি-পাতিলের পাশাপাশি মাটির ব্যাংক, পুতুল, গরু-মহিষের খেলনা তৈরি করা হয়, যা বৈশাখী মেলায় বিক্রি হয়।
মৃৎশিল্পী অমিয় চন্দ্র পাল বলেন, “একসময় মৃৎশিল্পীদের অনেক কদর ছিল। এখন সেই কদর আর নেই। প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্যের কারণে মানুষ মাটির জিনিস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।”
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার শত্রুমর্দন কুমারপাড়াতেও একই চিত্র। একসময় বিখ্যাত এই গ্রামে এখন গুটিকয়েক পরিবার টিকিয়ে রেখেছেন বাপ-দাদার পেশা। মাটির জিনিসের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা বদল করছেন। কেউই চান না তাদের সন্তানরা এই অনিশ্চিত পেশায় আসুক।
মৃৎশিল্পী অধীর রুদ্র পাল বলেন, “মাটির জিনিস বানাতে অনেক খরচ হয়। কিন্তু বিক্রি কম। সরকার থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও মাসিক সহায়তা পেলে আমরা কাজ চালিয়ে যেতে পারতাম।”
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জাতীয় পরিষদের সদস্য আসম সালেহ সোহেল বলেন, “আধুনিক প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৃৎশিল্পকে আবারও জনপ্রিয় করা সম্ভব। এজন্য প্রশাসনের উদ্যোগ প্রয়োজন।”
লেখক ও গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন, “যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মাটির জিনিসপত্র তার ঐতিহ্য হারাচ্ছে। ফলে এ পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষের জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও তারা স্বপ্ন দেখেন—একদিন আবারও মাটির পণ্যের কদর বাড়বে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। না হলে কালের আবর্তে হারিয়ে যাবে বাংলার হাজার বছরের এই শিল্প ঐতিহ্য।