শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ড্রেজারের দখলে জাফলং বিলীন হচ্ছে জনপদ অভিযোগের কেন্দ্রে 'ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ'


সিলেট এডিশন ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৯ জুন ২০২৬, ১০:২৯ পিএম

ড্রেজারের দখলে জাফলং বিলীন হচ্ছে জনপদ অভিযোগের কেন্দ্রে 'ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ'
নিজস্ব প্রতিবেদক: মাত্র তিন-চারটি মৌজার বালুমহাল ইজারা নিয়েই দ্বিগুণেরও বেশি এলাকায় চলছে বালু উত্তোলন। তাও আবার ইজারার শর্ত উপেক্ষা করে হাজার হাজার ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে। অভিযোগ উঠেছে, গোয়াইনঘাটের পশ্চিম জাফলংয়ে নবসৃষ্ট হাজীপুর বালুমহালের ইজারাদার মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ বালু লুটের এক বিশাল সিন্ডিকেট। স্থানীয়দের ভাষায়, "গোটা জাফলংকে গিলে খাচ্ছে ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ।" অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে হাজীপুর বালুমহালের ইজারা পায় হাফিজ আব্দুল্লাহর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ। ইজারা অনুযায়ী পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের লাটি, লাবু, কালিজুরি ও দক্ষিণ প্রতাপপুর মৌজা থেকে শুধুমাত্র সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের অনুমতি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই শর্তের কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। বরং অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত ইজারাভুক্ত এলাকার বাইরে পশ্চিম জাফলং, গোয়াইনঘাট সদর ও মধ্য জাফলং ইউনিয়নের উত্তর প্রতাপপুর, লুনি, আমবাড়ি ও দক্ষিণ প্রতাপপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় দিন-রাত কয়েক হাজার ড্রেজার মেশিন বসিয়ে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন কয়েক লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করে নদীপথে শত শত বাল্কহেড ও কার্গোযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। শ্রমিকদের দাবি, প্রতিদিন উত্তোলিত বালুর বাজারমূল্য দুই থেকে তিন কোটি টাকারও বেশি। অবৈধ উত্তোলনের কারণে শত শত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে বসতঘর, গ্রাম ও জনপদ। একই সঙ্গে হুমকির মুখে রয়েছে জাফলং চা বাগানের মালিকানাধীন তিনটি খেলার মাঠ। প্রতাপপুর ও পাঁচহাতিখেল এলাকার পিয়াইন নদীর অংশ আনন্দ খালে কয়েক মাস ধরে পেলোডার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র নদীর তীরে বিশাল বিশাল গর্ত তৈরি করে অবাধে বালু তুলে নিচ্ছে। অভিযুক্তদের মধ্যে লুনি গ্রামের খায়রুল আমিন, কামরুল ইসলাম, ফয়জুল ইসলাম, তোফায়েল আহমদ ও দেলোয়ার হোসেনের নাম বারবার উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদকের হাতে আসা একাধিক ভিডিও ও স্থিরচিত্রে দেখা যায়, রাতের আঁধারে টর্চলাইটের আলোয় শতাধিক শ্রমিক বালু উত্তোলন করছে। দিনের বেলায় একই এলাকায় সারি সারি ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদীর তলদেশ কেটে বালু তুলতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, জাফলংয়ে অতীতে অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত একটি শক্তিশালী চক্র এখন নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। প্রতাপপুর এলাকায় যারা বর্তমানে বালু উত্তোলন করছে, তাদের অনেকেই অতীতে জাফলং ধ্বংসের ঘটনায় অভিযুক্ত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, তারা বিভিন্ন সময় লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। খায়রুল, কামরুলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে গত এক যুগে ২৫ থেকে ৩০টি মামলা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা আপস, প্রভাব কিংবা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে দায়মুক্তি পেয়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। গত ১৩ জানুয়ারি দক্ষিণ প্রতাপপুরের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন বুলবুল খায়রুল, নুরুলসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। অভিযোগে বলা হয়, ড্রেজার দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়ায় তাকে মারধর করা হয়। এর আগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর দক্ষিণ প্রতাপপুরের এমদাদুর রহমান এলাকাবাসীর পক্ষে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। সেখানে অবৈধ বালু উত্তোলন, চাঁদাবাজি, নদীভাঙন এবং বসতভিটা বিলীন হওয়ার বিষয় তুলে ধরা হয়। একই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর আরেক বাসিন্দা বিল্লাল হোসেনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিনিয়র সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিপামনি দোবি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এছাড়া গত বছরের ২৬ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক ফুটবল মাঠ ও আশপাশের এলাকা থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু অভিযোগের পর অভিযোগ জমা হলেও মাঠে বাস্তব চিত্র বদলায়নি। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন—সব জায়গা থেকেই অব্যাহতভাবে বালু উত্তোলন চলছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জাফলং চা বাগানের লুনি ফুটবল মাঠসহ দক্ষিণ প্রতাপপুরের আরও দুটি মাঠ এখন নদীভাঙনের ঝুঁকিতে। বর্ষা এলেই লুনি গ্রামের অমৃকা লাল ও কুলন্দ নাথের বাড়ি নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই ঝুঁকিতে আছেন দক্ষিণ প্রতাপপুরের আব্দুল জলিল, আবুল হোসেন, কমল নাথসহ আরও অনেক পরিবার। পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের হাজীপুর এলাকাতেও পিয়াইন নদীতে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে হেলেনা বেগম ও তরিক উল্লাহসহ একাধিক পরিবারের নাম জানা গেছে। অভিযোগ অস্বীকার করে খায়রুল আমিন বলেন, "বালু উত্তোলনের সঙ্গে আমি জড়িত—এমনটি কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। হাজীপুর বালুমহালের ইজারাদাররা কীভাবে বালু উত্তোলন করছে, সেটি তারাই জানে।" মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হাফিজ আব্দুল্লাহ বলেন, "আমি শুধুমাত্র লাটি, লাবু, কালিজুরি ও দক্ষিণ প্রতাপপুর মৌজায় সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করছি। ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমার জানা নেই।" গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, খায়রুলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি মামলাও করা হয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য, স্থানীয়দের অভিযোগ, ভিডিওচিত্র, পূর্বের মামলা এবং প্রশাসনের বক্তব্য মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—হাজীপুর বালুমহালের ইজারার শর্ত বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। যেখানে ইজারায় সনাতন পদ্ধতিতে সীমিত এলাকায় বালু উত্তোলনের অনুমতি, সেখানে যদি ড্রেজার ব্যবহার করে বিস্তীর্ণ এলাকায় কোটি কোটি টাকার বালু উত্তোলন হয়ে থাকে, তবে তা শুধু ইজারার শর্ত লঙ্ঘন নয়; পরিবেশ, নদী ও জনজীবনের জন্যও ভয়াবহ হুমকি। স্থানীয়দের দাবি, হাজীপুর বালুমহালের সীমানা, উত্তোলনের পদ্ধতি, ড্রেজার ব্যবহারের অভিযোগ, উত্তোলিত বালুর পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে অবৈধ উত্তোলনের মাধ্যমে পরিবেশ ও জনপদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার দায় নিরূপণ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: /৫ ( ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

নগরীতে বাস্তবায়ন হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

নগরীতে বাস্তবায়ন হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

মহানগরীর মোগলাবাজার থানাধীন খালেরমুখ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ১০ হাজার ইয়াবাসহ ৩জন গ্রেফতার

মহানগরীর মোগলাবাজার থানাধীন খালেরমুখ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ১০ হাজার ইয়াবাসহ ৩জন গ্রেফতার

শাল্লার কান্দিগাঁও গ্রামের ঐতিহ্যবাহ নৌকা বাইচ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী

শাল্লার কান্দিগাঁও গ্রামের ঐতিহ্যবাহ নৌকা বাইচ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী

ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় দুই সেনাসদস্য নিহত

ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় দুই সেনাসদস্য নিহত

তালাশ টেলিভিশনে নারীকে শিকল পড়িয়ে হাটিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর তোলপাড়: কিশোরীকে নির্যাতনের ঘটনায় আটক ৩

তালাশ টেলিভিশনে নারীকে শিকল পড়িয়ে হাটিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর তোলপাড়: কিশোরীকে নির্যাতনের ঘটনায় আটক ৩

ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড শপিং সেন্টারে অগ্নিকাণ্ডস্থল পরিদর্শনে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ

ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড শপিং সেন্টারে অগ্নিকাণ্ডস্থল পরিদর্শনে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ

ইসিএ এলাকায় তাণ্ডবের বিরুদ্ধে অভিযান, ধ্বংস ১০ ড্রেজার ও ৬ এক্সকেভেটর

ইসিএ এলাকায় তাণ্ডবের বিরুদ্ধে অভিযান, ধ্বংস ১০ ড্রেজার ও ৬ এক্সকেভেটর

২১৭ কোটি টাকার রেল প্রকল্পে ধীরগতি, মেয়াদ শেষেও বাকি ৭৫ শতাংশ কাজ

২১৭ কোটি টাকার রেল প্রকল্পে ধীরগতি, মেয়াদ শেষেও বাকি ৭৫ শতাংশ কাজ

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান: শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে সেবা চালু

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান: শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে সেবা চালু

কনজিউমার রাইটস বাংলাদেশ-সিআরবি' সিলেট বিভাগীয় শাখার কার্যনির্বাহী কমিটির শপথ গ্রহণ

কনজিউমার রাইটস বাংলাদেশ-সিআরবি' সিলেট বিভাগীয় শাখার কার্যনির্বাহী কমিটির শপথ গ্রহণ

নগরীতে বাস্তবায়ন হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

নগরীতে বাস্তবায়ন হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

মহানগরীর মোগলাবাজার থানাধীন খালেরমুখ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ১০ হাজার ইয়াবাসহ ৩জন গ্রেফতার

মহানগরীর মোগলাবাজার থানাধীন খালেরমুখ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ১০ হাজার ইয়াবাসহ ৩জন গ্রেফতার

১৫ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির সিলেট সফর, প্রস্তুতিমূলক সভায় মন্ত্রীর নির্দেশনা

১৫ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির সিলেট সফর, প্রস্তুতিমূলক সভায় মন্ত্রীর নির্দেশনা

ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় দুই সেনাসদস্য নিহত

ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় দুই সেনাসদস্য নিহত

তালাশ টেলিভিশনে নারীকে শিকল পড়িয়ে হাটিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর তোলপাড়: কিশোরীকে নির্যাতনের ঘটনায় আটক ৩

তালাশ টেলিভিশনে নারীকে শিকল পড়িয়ে হাটিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর তোলপাড়: কিশোরীকে নির্যাতনের ঘটনায় আটক ৩

ইসিএ এলাকায় তাণ্ডবের বিরুদ্ধে অভিযান, ধ্বংস ১০ ড্রেজার ও ৬ এক্সকেভেটর

ইসিএ এলাকায় তাণ্ডবের বিরুদ্ধে অভিযান, ধ্বংস ১০ ড্রেজার ও ৬ এক্সকেভেটর

ভ্যান সরানো নিয়ে কথা-কাটাকাটি, পরে যুবককে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ

ভ্যান সরানো নিয়ে কথা-কাটাকাটি, পরে যুবককে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ

খাদিমনগরে সরকারি খাস জমিতে অ্যালুমিনিয়াম কারখানা স্থাপনের অভিযোগ

খাদিমনগরে সরকারি খাস জমিতে অ্যালুমিনিয়াম কারখানা স্থাপনের অভিযোগ

খাদিমনগরে খাস জমি দখলের অভিযোগ, পাহাড় কেটে গড়ে উঠছে প্লট

খাদিমনগরে খাস জমি দখলের অভিযোগ, পাহাড় কেটে গড়ে উঠছে প্লট

সিলেট সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৩৬ লাখ টাকার চোরাচালানি মালামাল জব্দ!

সিলেট সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৩৬ লাখ টাকার চোরাচালানি মালামাল জব্দ!

সিলেট এডিশন

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ড্রেজারের দখলে জাফলং বিলীন হচ্ছে জনপদ অভিযোগের কেন্দ্রে 'ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ'

প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬

featured Image
নিজস্ব প্রতিবেদক: মাত্র তিন-চারটি মৌজার বালুমহাল ইজারা নিয়েই দ্বিগুণেরও বেশি এলাকায় চলছে বালু উত্তোলন। তাও আবার ইজারার শর্ত উপেক্ষা করে হাজার হাজার ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে। অভিযোগ উঠেছে, গোয়াইনঘাটের পশ্চিম জাফলংয়ে নবসৃষ্ট হাজীপুর বালুমহালের ইজারাদার মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ বালু লুটের এক বিশাল সিন্ডিকেট। স্থানীয়দের ভাষায়, "গোটা জাফলংকে গিলে খাচ্ছে ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ।" অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে হাজীপুর বালুমহালের ইজারা পায় হাফিজ আব্দুল্লাহর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ। ইজারা অনুযায়ী পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের লাটি, লাবু, কালিজুরি ও দক্ষিণ প্রতাপপুর মৌজা থেকে শুধুমাত্র সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের অনুমতি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই শর্তের কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। বরং অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত ইজারাভুক্ত এলাকার বাইরে পশ্চিম জাফলং, গোয়াইনঘাট সদর ও মধ্য জাফলং ইউনিয়নের উত্তর প্রতাপপুর, লুনি, আমবাড়ি ও দক্ষিণ প্রতাপপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় দিন-রাত কয়েক হাজার ড্রেজার মেশিন বসিয়ে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন কয়েক লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করে নদীপথে শত শত বাল্কহেড ও কার্গোযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। শ্রমিকদের দাবি, প্রতিদিন উত্তোলিত বালুর বাজারমূল্য দুই থেকে তিন কোটি টাকারও বেশি। অবৈধ উত্তোলনের কারণে শত শত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে বসতঘর, গ্রাম ও জনপদ। একই সঙ্গে হুমকির মুখে রয়েছে জাফলং চা বাগানের মালিকানাধীন তিনটি খেলার মাঠ। প্রতাপপুর ও পাঁচহাতিখেল এলাকার পিয়াইন নদীর অংশ আনন্দ খালে কয়েক মাস ধরে পেলোডার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র নদীর তীরে বিশাল বিশাল গর্ত তৈরি করে অবাধে বালু তুলে নিচ্ছে। অভিযুক্তদের মধ্যে লুনি গ্রামের খায়রুল আমিন, কামরুল ইসলাম, ফয়জুল ইসলাম, তোফায়েল আহমদ ও দেলোয়ার হোসেনের নাম বারবার উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদকের হাতে আসা একাধিক ভিডিও ও স্থিরচিত্রে দেখা যায়, রাতের আঁধারে টর্চলাইটের আলোয় শতাধিক শ্রমিক বালু উত্তোলন করছে। দিনের বেলায় একই এলাকায় সারি সারি ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদীর তলদেশ কেটে বালু তুলতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, জাফলংয়ে অতীতে অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত একটি শক্তিশালী চক্র এখন নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। প্রতাপপুর এলাকায় যারা বর্তমানে বালু উত্তোলন করছে, তাদের অনেকেই অতীতে জাফলং ধ্বংসের ঘটনায় অভিযুক্ত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, তারা বিভিন্ন সময় লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। খায়রুল, কামরুলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে গত এক যুগে ২৫ থেকে ৩০টি মামলা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা আপস, প্রভাব কিংবা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে দায়মুক্তি পেয়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। গত ১৩ জানুয়ারি দক্ষিণ প্রতাপপুরের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন বুলবুল খায়রুল, নুরুলসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। অভিযোগে বলা হয়, ড্রেজার দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়ায় তাকে মারধর করা হয়। এর আগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর দক্ষিণ প্রতাপপুরের এমদাদুর রহমান এলাকাবাসীর পক্ষে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। সেখানে অবৈধ বালু উত্তোলন, চাঁদাবাজি, নদীভাঙন এবং বসতভিটা বিলীন হওয়ার বিষয় তুলে ধরা হয়। একই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর আরেক বাসিন্দা বিল্লাল হোসেনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিনিয়র সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিপামনি দোবি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এছাড়া গত বছরের ২৬ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক ফুটবল মাঠ ও আশপাশের এলাকা থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু অভিযোগের পর অভিযোগ জমা হলেও মাঠে বাস্তব চিত্র বদলায়নি। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন—সব জায়গা থেকেই অব্যাহতভাবে বালু উত্তোলন চলছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জাফলং চা বাগানের লুনি ফুটবল মাঠসহ দক্ষিণ প্রতাপপুরের আরও দুটি মাঠ এখন নদীভাঙনের ঝুঁকিতে। বর্ষা এলেই লুনি গ্রামের অমৃকা লাল ও কুলন্দ নাথের বাড়ি নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই ঝুঁকিতে আছেন দক্ষিণ প্রতাপপুরের আব্দুল জলিল, আবুল হোসেন, কমল নাথসহ আরও অনেক পরিবার। পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের হাজীপুর এলাকাতেও পিয়াইন নদীতে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে হেলেনা বেগম ও তরিক উল্লাহসহ একাধিক পরিবারের নাম জানা গেছে। অভিযোগ অস্বীকার করে খায়রুল আমিন বলেন, "বালু উত্তোলনের সঙ্গে আমি জড়িত—এমনটি কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। হাজীপুর বালুমহালের ইজারাদাররা কীভাবে বালু উত্তোলন করছে, সেটি তারাই জানে।" মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হাফিজ আব্দুল্লাহ বলেন, "আমি শুধুমাত্র লাটি, লাবু, কালিজুরি ও দক্ষিণ প্রতাপপুর মৌজায় সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করছি। ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমার জানা নেই।" গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, খায়রুলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি মামলাও করা হয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য, স্থানীয়দের অভিযোগ, ভিডিওচিত্র, পূর্বের মামলা এবং প্রশাসনের বক্তব্য মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—হাজীপুর বালুমহালের ইজারার শর্ত বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। যেখানে ইজারায় সনাতন পদ্ধতিতে সীমিত এলাকায় বালু উত্তোলনের অনুমতি, সেখানে যদি ড্রেজার ব্যবহার করে বিস্তীর্ণ এলাকায় কোটি কোটি টাকার বালু উত্তোলন হয়ে থাকে, তবে তা শুধু ইজারার শর্ত লঙ্ঘন নয়; পরিবেশ, নদী ও জনজীবনের জন্যও ভয়াবহ হুমকি। স্থানীয়দের দাবি, হাজীপুর বালুমহালের সীমানা, উত্তোলনের পদ্ধতি, ড্রেজার ব্যবহারের অভিযোগ, উত্তোলিত বালুর পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে অবৈধ উত্তোলনের মাধ্যমে পরিবেশ ও জনপদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার দায় নিরূপণ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

সিলেট এডিশন

প্রকাশক ও সম্পাদক:
কামরুল হাসান জুলহাস

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
ড্রেজারের দখলে জাফলং বিলীন হচ্ছে জনপদ অভিযোগের কেন্দ্রে 'ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ'
0:00 / 0:00
1x