সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

হাওরের মাঠে কাটা ধান পানিতে অঙ্কুর গজিয়েছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি


সিলেট এডিশন ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬ মে ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম

হাওরের মাঠে কাটা ধান পানিতে অঙ্কুর গজিয়েছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
অতিবৃষ্টির কারণে হাওরের মাঠে কাটা ধান পানিতে তলিয়ে গিয়ে অঙ্কুর গজিয়েছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন সুনামগঞ্জের কৃষকেরা। দুদিন ধরে রোদ উঠায় সেই ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা। নষ্ট হয়ে যাওয়া ধানের পাশাপাশি পরিবার ও গবাদিপশু নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন তারা। আয়ের একমাত্র ভরসা ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে হাওরাঞ্চলের বহু কৃষক পরিবার। সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের ঝাউয়ার অংশে ঘুরে দেখা যায়, হাওরটির অর্ধেকের বেশি এলাকা পাকা ও কাঁচা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানির উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের বিল ও জলাশয় থেকে কচুরিপানা ভেসে এসে ধানক্ষেতে ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাসের টানে এলোমেলোভাবে ছুটে বেড়ানো কচুরিপানায় পুরো হাওর এখন ঢেকে গেছে। এ চিত্র দেখে কোথায় ধানক্ষেত আর কোথায় জলাশয়-তা আলাদা করে চেনার কোনো উপায় নেই। এভাবে অন্যান্য হাওরের পানিতে তলিয়ে যাওয়া ফসল নিয়েও আশা ছেড়ে দিয়েছেন কৃষকরা। এখন পর্যন্ত যতটুকু ধান কাটতে পেরেছেন, সেটুকুতেও অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। সেই ধান রক্ষায় শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। শুধু তাই নয়, গবাদিপশুর একমাত্র খাদ্য খড় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। কখনও মেঘ, কখনও বৃষ্টি আবার কখনও রোদ-এমন অনিশ্চিত আবহাওয়ায় ধান ও খড় শুকাতে পারছেন না। এতে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। দেখার হাওরের ঝাউয়ার অংশের হাসন বসত গ্রামের কৃষক ছাদ মিয়া বলেন, “আট কেয়ার জমিতে আবাদ করছিলাম। থোর আওয়ার সময় (ধানের শীষ বের হওয়ার আগে) তলাইয়া নিছে। তিনি বলেন, বাকি চার কেয়ার কাটছিলাম, কিন্তু অনেক ধানে গ্যাড়া (অঙ্কুর) এসে নষ্ট হয়ে গেছে। এই হাওরের উত্তাল পানিতে আরও এক কেয়ার জমির ধানও গ্যাছে। এ অবস্থায় চার ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী আর দুই নাতি মিলে আটজনের পরিবারের ভরণ পোষণ কীভাবে টানবেন সে চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছে কৃষক ছাদ মিয়ার। তার পাশেই দেখা গেল কাটা ধানের স্তুপ থেকে অঙ্কুরিত ধান বাছাই করছেন তার স্ত্রী জমিলা খাতুন। পচে যাওয়া খড় দেখিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “ধানের সঙ্গে খড়ও নিয়ে গেল। এখন চারটা গরুকে কীভাবে বাঁচাব?” সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের ঝাউয়ার অংশে গিয়ে দেখা যায় এক বিষন্ন দৃশ্য। সদর উপজেলার আচিনপুর গ্রামের নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল ধানকাটা শ্রমিক ধান কাটার উদ্দেশে হাওরে যাচ্ছেন। তারা হাসনবসত গ্রামের আছলাম মিয়ার ধান প্রতি বিঘা ৮০০ টাকা মজুরিতে কাটার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরেই তারা ফিরে আসেন। সেখানে দেখা যায়, কৃষকের ধান পুরোপুরি পানিতে ডুবে গেছে। এখন ধান কাটতে হলে কোমর পর্যন্ত পানিতে নামতে হবে; যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই তারা ধান না কেটেই ফিরে আসেন। এদিকে ওই এলাকার যেসব জমি তীরের কাছাকাছি ছিল এবং এখনো কিছুটা ভেসে ছিল সেগুলোও পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে সেগুলোও আর কাটার উপযোগী অবস্থায় নেই। ধানকাটা দলের সরদার নজরুল ইসলাম বলছিলেন, “ধান কাটতে অইলে গলাপানিত নামতো অইবো। ক্ষেত দেইখ্যা ভয় করে, তাই ফিইর‌্যা আইছি। ধান কাটাত নামলে জান্দা (ঠান্ডা) পানিত অসুখ অইবো। ক্ষেতেই অবস্থা দেইখ্যা কোনও ‘বেফারি’ ধান কাটতে চায়না।” কালিপুর গ্রামের প্রান্তিক কৃষক সাদিকুর রহমান বলেন, “অসুস্থ হওয়ার পর পিত্ততলির অপারেশন করাইছি। ধার দেনা করে আড়াই কেয়ার জমিনো ধান লাগাইছলাম। দুই কিয়ারই পানির তলে। “আধ কেয়ার কাটলেও এখন গ্যাড়া আইয়া নষ্ট করিলিছে। তলাইয়া যাওয়া ধান আর কাটার উপায় নাই। কামলা আইয়া ফিইরা যারগি। কেউ কাটতো চায়না গলাপানির ধান।” ধান মাড়াইয়ে এবার বড় লোকসান এদিকে শুধু কৃষকের ধানই তলিয়ে যায়নি। ধান মাড়াই করতে যে যন্ত্র বা ‘বোমা মেশিন’ আছে তার চালক ও মালিকরাও এবার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বৈশাখী তোলার জন্য প্রতিটি যন্ত্রের মালিক ১৫-২০ হাজার টাকা করে খরচ করে মেশিনগুলো সচল করেছিলেন। কোনও মালিকই এবার ২০-৩০ মণের ধান সংগ্রহ করতে পারেননি। অথচ অন্যান্য বছর প্রতিটি মেশিন অন্তত ১০০ মন ধান সংগ্রহ করতে পারতো মাড়াই করে। কালিপুর গ্রামের ধান মাড়াই মেশিনের মালিক সিরাজ মিয়া বলেন, “অন্যান্যবার ১০০ থেকে ৮০ মণ ধান রুজি করতে পারতাম। এবারও ২০ হাজার টেকা খরচ কইরা মেশিন ঠিক করছিলাম। এখন পর্যন্ত ৩০ মণ ধানও তোলতাম পারিনি। গিরস্তু ধান তোলতে পারছে না, আমরা কোয়াই তনি পাইমু?” কালিপুরের মেশিন চালক চান মিয়া বলেন, “একটা মেশিন চালাইতে কম পক্ষে তিনজন মানুষ লাগে। রাস্তা খারাপ অইলে আরো দুজন বেশি লাগে, ঠেলানোর লাগি। বছর ভালা অইলে প্রত্যেকে গড়ে ১৫ মণ ধান রুজি করতে পারে। কিন্তু এবার এখনো ১৫ মণ ধান পাইনি। আস্তা আওর ডুইব্যা নষ্ট অইয়া গ্যাছে।” ধানের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে দুপক্ষের ভিন্ন তথ্য সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেনরায় বলেন, “হাওরে সব মিলিয়ে ৬০ ভাগের মতো ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এমনকি কাটা ধানও অর্ধেক নষ্ট হয়ে গেছে। “কিন্তু কৃষি বিভাগ প্রকৃত ক্ষতির তথ্য আড়াল করে ক্ষতি কমিয়ে দেখাচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে দেখানোয় কৃষকরা প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হবেন।” সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, হাওরে এখন পর্যন্ত ৭৭ ভাগ জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। হাওরে আবাদ করা ১ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টরের মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার হেক্টর কাটা হয়েছে। তিনি বলেন, জেলায় এবার হাওর ও নন হাওর মিলিয়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছিল। এর মধ্যে হাওর ও নন হাওর মিলিয়ে ৬৫.৯৩৫ শতাংশ কাটা হয়ে গেছে।” ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে।”  

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

লিজ থেকে মামলা, মামলা থেকে দখল—বহর মৌজার খাস জমির গল্প

লিজ থেকে মামলা, মামলা থেকে দখল—বহর মৌজার খাস জমির গল্প

বহর-খাদিমনগরে চা-বাগান ও খাস ভূমি নিয়ে দখল-বেচাকেনার অভিযোগ

বহর-খাদিমনগরে চা-বাগান ও খাস ভূমি নিয়ে দখল-বেচাকেনার অভিযোগ

মুক্তিযোদ্ধাদের প্লটেও থাবা, টিলা কেটে চলছে স্থাপনা নির্মাণ

মুক্তিযোদ্ধাদের প্লটেও থাবা, টিলা কেটে চলছে স্থাপনা নির্মাণ

সিলেটে আদালতে মামলা চলমান, তবুও খাস জমি দখল ও স্ট্যাম্পে বেচাকেনার অভিযোগ খোকনের বিরুদ্ধে ‎

সিলেটে আদালতে মামলা চলমান, তবুও খাস জমি দখল ও স্ট্যাম্পে বেচাকেনার অভিযোগ খোকনের বিরুদ্ধে ‎

ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ: আশ্বাসে মেলেনি সমাধান, শহীদ মিনারে কর্মসূচি

ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ: আশ্বাসে মেলেনি সমাধান, শহীদ মিনারে কর্মসূচি

শাল্লার কান্দিগাঁও গ্রামের ঐতিহ্যবাহ নৌকা বাইচ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী

শাল্লার কান্দিগাঁও গ্রামের ঐতিহ্যবাহ নৌকা বাইচ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী

ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড শপিং সেন্টারে অগ্নিকাণ্ডস্থল পরিদর্শনে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ

ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড শপিং সেন্টারে অগ্নিকাণ্ডস্থল পরিদর্শনে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ

২১৭ কোটি টাকার রেল প্রকল্পে ধীরগতি, মেয়াদ শেষেও বাকি ৭৫ শতাংশ কাজ

২১৭ কোটি টাকার রেল প্রকল্পে ধীরগতি, মেয়াদ শেষেও বাকি ৭৫ শতাংশ কাজ

মহানগরীর মোগলাবাজার থানাধীন খালেরমুখ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ১০ হাজার ইয়াবাসহ ৩জন গ্রেফতার

মহানগরীর মোগলাবাজার থানাধীন খালেরমুখ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ১০ হাজার ইয়াবাসহ ৩জন গ্রেফতার

দক্ষিণ সুরমার সিলামে রাসেল হত্যা: ২২ জনের নাম উল্লেখ করে মায়ের মামলা

দক্ষিণ সুরমার সিলামে রাসেল হত্যা: ২২ জনের নাম উল্লেখ করে মায়ের মামলা

দক্ষ যুব গড়ব দেশ সবার জন্য বাংলাদেশ,  জৈন্তাপুরে জাতীয় যুব দিবস পালিত, যুব ঋণের চেক ও সম্মাননা স্মারক  বিতরণ

দক্ষ যুব গড়ব দেশ সবার জন্য বাংলাদেশ, জৈন্তাপুরে জাতীয় যুব দিবস পালিত, যুব ঋণের চেক ও সম্মাননা স্মারক বিতরণ

সিলেটে ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সাহসী অভিযাত্রায় ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

সিলেটে ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সাহসী অভিযাত্রায় ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

সিলেটে এক্সিলেন্ট গ্রুপের স্টার সেলিব্রেশন অ্যান্ড বিজনেস অপরচুনিটি সামিট অনুষ্ঠিত

সিলেটে এক্সিলেন্ট গ্রুপের স্টার সেলিব্রেশন অ্যান্ড বিজনেস অপরচুনিটি সামিট অনুষ্ঠিত

৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি,আবেগঘন আয়োজনে অধ্যক্ষ আব্দুছ শহীদকে বিদায় সংবর্ধনা

৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি,আবেগঘন আয়োজনে অধ্যক্ষ আব্দুছ শহীদকে বিদায় সংবর্ধনা

শাল্লা উপজেলায় নিজগাঁও গ্রামে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১, এলাকায় উত্তেজনা

শাল্লা উপজেলায় নিজগাঁও গ্রামে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১, এলাকায় উত্তেজনা

সিলেট সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জাঙ্গাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন’ উপলক্ষে এক প্রচার র‌্যালি

সিলেট সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জাঙ্গাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন’ উপলক্ষে এক প্রচার র‌্যালি

সিলেটে সাংবাদিকদের ‘ঐক্যবদ্ধসমাবেশ’ থেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কঠোর হুশিয়ারী

সিলেটে সাংবাদিকদের ‘ঐক্যবদ্ধসমাবেশ’ থেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কঠোর হুশিয়ারী

কানাইঘাট সীমান্তে বিজিবির অভিযান, ১৬ লাখ টাকার অবৈধ পণ্য জব্দ

কানাইঘাট সীমান্তে বিজিবির অভিযান, ১৬ লাখ টাকার অবৈধ পণ্য জব্দ

আলোচনায় ফিফটি ফাইভ পার্সেন্ট! ‘লুজার’ ছকে ‘উজাড়’ যাদুকাটা

আলোচনায় ফিফটি ফাইভ পার্সেন্ট! ‘লুজার’ ছকে ‘উজাড়’ যাদুকাটা

মাদক বিরোধের জেরে শাল্লায় বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট

মাদক বিরোধের জেরে শাল্লায় বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট

সিলেট এডিশন

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬


হাওরের মাঠে কাটা ধান পানিতে অঙ্কুর গজিয়েছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬

featured Image
অতিবৃষ্টির কারণে হাওরের মাঠে কাটা ধান পানিতে তলিয়ে গিয়ে অঙ্কুর গজিয়েছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন সুনামগঞ্জের কৃষকেরা। দুদিন ধরে রোদ উঠায় সেই ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা। নষ্ট হয়ে যাওয়া ধানের পাশাপাশি পরিবার ও গবাদিপশু নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন তারা। আয়ের একমাত্র ভরসা ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে হাওরাঞ্চলের বহু কৃষক পরিবার। সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের ঝাউয়ার অংশে ঘুরে দেখা যায়, হাওরটির অর্ধেকের বেশি এলাকা পাকা ও কাঁচা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানির উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের বিল ও জলাশয় থেকে কচুরিপানা ভেসে এসে ধানক্ষেতে ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাসের টানে এলোমেলোভাবে ছুটে বেড়ানো কচুরিপানায় পুরো হাওর এখন ঢেকে গেছে। এ চিত্র দেখে কোথায় ধানক্ষেত আর কোথায় জলাশয়-তা আলাদা করে চেনার কোনো উপায় নেই। এভাবে অন্যান্য হাওরের পানিতে তলিয়ে যাওয়া ফসল নিয়েও আশা ছেড়ে দিয়েছেন কৃষকরা। এখন পর্যন্ত যতটুকু ধান কাটতে পেরেছেন, সেটুকুতেও অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। সেই ধান রক্ষায় শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। শুধু তাই নয়, গবাদিপশুর একমাত্র খাদ্য খড় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। কখনও মেঘ, কখনও বৃষ্টি আবার কখনও রোদ-এমন অনিশ্চিত আবহাওয়ায় ধান ও খড় শুকাতে পারছেন না। এতে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। দেখার হাওরের ঝাউয়ার অংশের হাসন বসত গ্রামের কৃষক ছাদ মিয়া বলেন, “আট কেয়ার জমিতে আবাদ করছিলাম। থোর আওয়ার সময় (ধানের শীষ বের হওয়ার আগে) তলাইয়া নিছে। তিনি বলেন, বাকি চার কেয়ার কাটছিলাম, কিন্তু অনেক ধানে গ্যাড়া (অঙ্কুর) এসে নষ্ট হয়ে গেছে। এই হাওরের উত্তাল পানিতে আরও এক কেয়ার জমির ধানও গ্যাছে। এ অবস্থায় চার ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী আর দুই নাতি মিলে আটজনের পরিবারের ভরণ পোষণ কীভাবে টানবেন সে চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছে কৃষক ছাদ মিয়ার। তার পাশেই দেখা গেল কাটা ধানের স্তুপ থেকে অঙ্কুরিত ধান বাছাই করছেন তার স্ত্রী জমিলা খাতুন। পচে যাওয়া খড় দেখিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “ধানের সঙ্গে খড়ও নিয়ে গেল। এখন চারটা গরুকে কীভাবে বাঁচাব?” সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের ঝাউয়ার অংশে গিয়ে দেখা যায় এক বিষন্ন দৃশ্য। সদর উপজেলার আচিনপুর গ্রামের নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল ধানকাটা শ্রমিক ধান কাটার উদ্দেশে হাওরে যাচ্ছেন। তারা হাসনবসত গ্রামের আছলাম মিয়ার ধান প্রতি বিঘা ৮০০ টাকা মজুরিতে কাটার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরেই তারা ফিরে আসেন। সেখানে দেখা যায়, কৃষকের ধান পুরোপুরি পানিতে ডুবে গেছে। এখন ধান কাটতে হলে কোমর পর্যন্ত পানিতে নামতে হবে; যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই তারা ধান না কেটেই ফিরে আসেন। এদিকে ওই এলাকার যেসব জমি তীরের কাছাকাছি ছিল এবং এখনো কিছুটা ভেসে ছিল সেগুলোও পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে সেগুলোও আর কাটার উপযোগী অবস্থায় নেই। ধানকাটা দলের সরদার নজরুল ইসলাম বলছিলেন, “ধান কাটতে অইলে গলাপানিত নামতো অইবো। ক্ষেত দেইখ্যা ভয় করে, তাই ফিইর‌্যা আইছি। ধান কাটাত নামলে জান্দা (ঠান্ডা) পানিত অসুখ অইবো। ক্ষেতেই অবস্থা দেইখ্যা কোনও ‘বেফারি’ ধান কাটতে চায়না।” কালিপুর গ্রামের প্রান্তিক কৃষক সাদিকুর রহমান বলেন, “অসুস্থ হওয়ার পর পিত্ততলির অপারেশন করাইছি। ধার দেনা করে আড়াই কেয়ার জমিনো ধান লাগাইছলাম। দুই কিয়ারই পানির তলে। “আধ কেয়ার কাটলেও এখন গ্যাড়া আইয়া নষ্ট করিলিছে। তলাইয়া যাওয়া ধান আর কাটার উপায় নাই। কামলা আইয়া ফিইরা যারগি। কেউ কাটতো চায়না গলাপানির ধান।” ধান মাড়াইয়ে এবার বড় লোকসান এদিকে শুধু কৃষকের ধানই তলিয়ে যায়নি। ধান মাড়াই করতে যে যন্ত্র বা ‘বোমা মেশিন’ আছে তার চালক ও মালিকরাও এবার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বৈশাখী তোলার জন্য প্রতিটি যন্ত্রের মালিক ১৫-২০ হাজার টাকা করে খরচ করে মেশিনগুলো সচল করেছিলেন। কোনও মালিকই এবার ২০-৩০ মণের ধান সংগ্রহ করতে পারেননি। অথচ অন্যান্য বছর প্রতিটি মেশিন অন্তত ১০০ মন ধান সংগ্রহ করতে পারতো মাড়াই করে। কালিপুর গ্রামের ধান মাড়াই মেশিনের মালিক সিরাজ মিয়া বলেন, “অন্যান্যবার ১০০ থেকে ৮০ মণ ধান রুজি করতে পারতাম। এবারও ২০ হাজার টেকা খরচ কইরা মেশিন ঠিক করছিলাম। এখন পর্যন্ত ৩০ মণ ধানও তোলতাম পারিনি। গিরস্তু ধান তোলতে পারছে না, আমরা কোয়াই তনি পাইমু?” কালিপুরের মেশিন চালক চান মিয়া বলেন, “একটা মেশিন চালাইতে কম পক্ষে তিনজন মানুষ লাগে। রাস্তা খারাপ অইলে আরো দুজন বেশি লাগে, ঠেলানোর লাগি। বছর ভালা অইলে প্রত্যেকে গড়ে ১৫ মণ ধান রুজি করতে পারে। কিন্তু এবার এখনো ১৫ মণ ধান পাইনি। আস্তা আওর ডুইব্যা নষ্ট অইয়া গ্যাছে।” ধানের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে দুপক্ষের ভিন্ন তথ্য সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেনরায় বলেন, “হাওরে সব মিলিয়ে ৬০ ভাগের মতো ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এমনকি কাটা ধানও অর্ধেক নষ্ট হয়ে গেছে। “কিন্তু কৃষি বিভাগ প্রকৃত ক্ষতির তথ্য আড়াল করে ক্ষতি কমিয়ে দেখাচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে দেখানোয় কৃষকরা প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হবেন।” সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, হাওরে এখন পর্যন্ত ৭৭ ভাগ জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। হাওরে আবাদ করা ১ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টরের মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার হেক্টর কাটা হয়েছে। তিনি বলেন, জেলায় এবার হাওর ও নন হাওর মিলিয়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছিল। এর মধ্যে হাওর ও নন হাওর মিলিয়ে ৬৫.৯৩৫ শতাংশ কাটা হয়ে গেছে।” ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে।”  

সিলেট এডিশন

প্রকাশক ও সম্পাদক:
কামরুল হাসান জুলহাস

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
হাওরের মাঠে কাটা ধান পানিতে অঙ্কুর গজিয়েছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
0:00 / 0:00
1x