সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

সম্পাদকীয়

ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে শুধু সভা নয়, চাই কঠোর বাস্তবায়ন

সিলেটে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯) যথাযথভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইটভাটা মালিকদের সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের মতবিনিময় সভা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে ইটভাটার ধোঁয়া, অপরিকল্পিত অবস্থান, কৃষিজমির মাটি ব্যবহার এবং জ্বালানি কাঠ পোড়ানোর মতো কর্মকাণ্ড পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। তাই আইন মেনে ইটভাটা পরিচালনার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সচেতন করা জরুরি।তবে বাস্তবতা হলো, শুধু সভা, আলোচনা কিংবা সতর্কবার্তা দিয়ে ইটভাটার দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নিয়মিত নজরদারি। বৈধ লাইসেন্স ছাড়া ইটভাটা পরিচালনা, অনুমোদিত উৎসের বাইরে থেকে মাটি সংগ্রহ, জ্বালানি কাঠ ব্যবহার কিংবা নির্ধারিত দূরত্ব ও পরিবেশগত শর্ত অমান্য করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বৈধভাবে পরিচালিত ইটভাটাগুলোকেও নির্ধারিত পরিবেশগত মান বজায় রাখতে বাধ্য করতে হবে।পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে পোড়ানো ইটের পরিবর্তে ব্লক ইট উৎপাদনের দিকে যাওয়ার আহ্বান সময়োপযোগী। কারণ নির্মাণ খাতে পরিবেশবান্ধব বিকল্প বাড়ানো না গেলে ইটভাটার ওপর নির্ভরতা কমানো কঠিন হবে। তবে প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের বাস্তব সক্ষমতা, বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা এবং পর্যাপ্ত সময়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।মতবিনিময় সভায় ইটভাটা মালিকদের পক্ষ থেকেও কয়লার সালফারের মাত্রা, নদীর পলি ও খাল খননের মাটি ব্যবহারের সুযোগ এবং ইটভাটার দূরত্বসংক্রান্ত বিধান নিয়ে বিভিন্ন মতামত দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়কে শুধু দাবি হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আইন ও পরিবেশগত বাস্তবতার আলোকে প্রতিটি প্রস্তাব পর্যালোচনা করা। বিশেষ করে নদী ও খাল খননের মাটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং মাটি সংগ্রহের বৈধতা নিশ্চিত করা জরুরি।ইটভাটা শিল্পের সঙ্গে কর্মসংস্থান ও নির্মাণ খাতের সরবরাহব্যবস্থা জড়িত—এ বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার নামে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি মেনে নেওয়া যায় না। উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই হতে হবে নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কোনো ইটভাটা মালিক যেন প্রভাব, পরিচয় বা অন্য কোনো কারণে ছাড় না পান; আবার বৈধভাবে পরিচালিত উদ্যোক্তারাও যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন। নিয়মিত পরিদর্শন, স্বচ্ছ লাইসেন্স ব্যবস্থা, পরিবেশগত মান যাচাই এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা—এই চারটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব।সিলেটে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভাটি তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সভা হয়ে না থেকে কার্যকর কর্মপরিকল্পনার সূচনা হওয়া উচিত। অবৈধ ইটভাটা বন্ধ, বৈধ ভাটায় কঠোর পরিবেশগত মান নিশ্চিত এবং ধাপে ধাপে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং ইটভাটা মালিকদের সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমেই এ উদ্যোগ সফল হতে পারে।পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। সভায় দেওয়া নির্দেশনা যদি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়, তবেই ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য আসবে।

ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে শুধু সভা নয়, চাই কঠোর বাস্তবায়ন