প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
হাওরের কান্না, তালিকার কারসাজি: সহায়তা পেল কারা?
সিলেট এডিশন ডেস্ক
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তার তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে অকৃষক ও অক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিবাদে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন কৃষকরা।
গত দুই দিন ধরে ধর্মপাশা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ঘেরাও ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন ক্ষুব্ধ কৃষকরা। এর আগে ঈদের আগেও শাল্লা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে একই দাবিতে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে টানা ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় জেলার হাওরাঞ্চলের পাকা বোরো ধান তলিয়ে যায়। অনেক কৃষক ধান কাটলেও অব্যাহত বৃষ্টির কারণে তা শুকাতে না পেরে পচে নষ্ট হয়ে যায়। একই সঙ্গে ব্যাপক ক্ষতি হয় গোখাদ্য খড়ের।
ক্ষয়ক্ষতির পর সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় জেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন করে। পরে ১ লাখ ২৯ হাজার ৫০৪ জন কৃষকের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৭৮৬ হেক্টর জমি।
তবে হাওর আন্দোলনের নেতারা দাবি করেছেন, টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় জেলার প্রায় অর্ধেক ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাটা ধান ও খড়েরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বড় কৃষক পরিবার রয়েছে ১২ হাজার ২৫১টি, মাঝারি ৬৭ হাজার ৮৯৮টি, ক্ষুদ্র ১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪০টি এবং প্রান্তিক কৃষক ৪৯ হাজার ১২৪ জন।
ঈদের আগে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ৬৪ হাজার কৃষককে সহায়তার জন্য চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত করে। তালিকাভুক্ত কৃষকদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি চাল করে তিন মাস সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শুরু থেকেই অভিযোগ ওঠে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও অর্থের বিনিময়ে অনেকের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ও হবিবপুর ইউনিয়নসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এ নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন এবং অক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নাম তালিকায় যুক্ত করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরহাটি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে ইউনিয়নের বড়খলা ও জিংড়িপাড়া গ্রামের কৃষকরাও বিক্ষোভ মিছিল করে দায়ীদের বিচার এবং বঞ্চিত কৃষকদের তালিকাভুক্তির দাবি জানান।
পাইকুরহাটি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি সবুজ মিয়া বলেন, “চেয়ারম্যান-মেম্বাররা নিজেদের আত্মীয়স্বজনের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যারা কৃষকই নন কিংবা যাদের কোনো ক্ষতি হয়নি, তারাও সহায়তা পাচ্ছেন। অথচ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বঞ্চিত হয়েছেন।”
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক উসমান গণি বলেন, “আমার অর্ধেক জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু আমার নাম তালিকায় নেই। টাকার বিনিময়ে অনেকের নাম দেওয়া হয়েছে। আমরা এই অনিয়মের বিচার চাই।”
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “প্রাথমিকভাবে পাঠানো তালিকা থেকে আংশিক ক্ষতিপূরণের জন্য প্রায় অর্ধেক কৃষককে বাছাই করা হয়েছে। ঈদের আগ থেকেই সহায়তা বিতরণ শুরু হয়েছে। বাদ পড়া অনেকেই এখন বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ করছেন।”
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, “আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকাভুক্ত করার। এখন বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, তালিকা পুনঃযাচাই করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে তারা ক্ষতিগ্রস্ত সকল কৃষকের জন্য সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রকাশক ও সম্পাদক: কামরুল হাসান জুলহাস
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।