প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
সোবহানীঘাট ফাঁড়ি না ‘গোপন দরবার’? এসআই শিপলুকে ঘিরে তোলপাড়
সিলেট এডিশন ডেস্ক
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সিলেট মহানগর পুলিশ-এর সোবহানীঘাট ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই শিপলু চৌধুরীকে ঘিরে সিলেটজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উঠেছে মাদক কারবারি, চোরাকারবারি ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, ফাঁড়ির দায়িত্ব পালনের চেয়ে পাশের হোটেলে গোপন বৈঠকেই তার আগ্রহ বেশি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সোবহানীঘাট ফাঁড়িতে এসআই শিপলু চৌধুরীকে খুব কমই পাওয়া যায়। ফাঁড়ি থেকে অল্প দূরত্বে অবস্থিত আল-করিম হোটেল যেন তার অঘোষিত ‘দ্বিতীয় কার্যালয়’। অভিযোগ রয়েছে, গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে চলে চোরাকারবারি ও অপরাধ জগতের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে গোপন বৈঠক। স্থানীয়দের দাবি, এই সখ্যতার সুযোগে সোবহানীঘাট-কালিঘাট সড়ক ব্যবহার করে অবাধে প্রবেশ করছে ভারতীয় অবৈধ মালামাল।
এদিকে, ফাঁড়ির নাকের ডগায় যতরপুর এলাকায় গড়ে ওঠা ‘হানিট্র্যাপ’ ও ব্ল্যাকমেইলিং চক্র নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ থাকলেও এসআই শিপলু ছিলেন রহস্যজনকভাবে নীরব। সম্প্রতি ৯৯৯-এ অভিযোগের ভিত্তিতে কোতোয়ালি থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই চক্রের সদস্যদের আটক করলে জনমনে প্রশ্ন ওঠে—পাশেই দায়িত্ব পালনকারী ফাঁড়ির ইনচার্জ কি সত্যিই কিছু জানতেন না, নাকি জেনেও নীরব ছিলেন?
এসআই শিপলুর বিরুদ্ধে খোদ পুলিশ বিভাগেও অসন্তোষের কথা জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিলেও তিনি নিয়মিত পুলিশের ইউনিফর্ম ব্যবহার করেন না। একাধিক ভিডিও ফুটেজে তাকে সাধারণ পোশাকে অভিযানে অংশ নিতে দেখা গেছে। এমনকি অপরাধীদের সঙ্গে বৈঠকের সময়ও তিনি সিভিল পোশাকে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, যেখানে এসএমপি কমিশনার নিয়মিত ইউনিফর্ম পরে দায়িত্ব পালন করেন, সেখানে একজন এসআই কীভাবে দিনের পর দিন উর্দি ছাড়া অভিযান পরিচালনা করেন, তা চেইন অব কমান্ডের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ও এসআই শিপলুর ভূমিকা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। সে সময় তিনি দক্ষিণ সুরমা থানার সেকেন্ড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ৪ আগস্ট হুমায়ুন চত্বর ও কদমতলী এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। ওই ঘটনায় দুই শতাধিক মানুষ আহত হন এবং বিএনপি কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসআই শিপলু নিজের পরিচয় গোপনের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তিনি নিজেকে নগরীর তালতলার বাসিন্দা দাবি করলেও তার বাড়ি দিরাই উপজেলা-এর তারুল ইউনিয়নের দলগ্রামে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত-এর পরিবারের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
সম্প্রতি নাইওরপুল এলাকায় অবৈধভাবে আসা ৭০ বস্তা ভারতীয় জিরার চালান জব্দের ঘটনাতেও নতুন প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, জিরার মালিক দাবিদার আব্দুস সাত্তার খান মিন্টু ভুয়া নিলামের কাগজপত্র নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও পুলিশের সামনেই পার পেয়ে যান।
মামলার এজাহারে এসআই শিপলু নিজেই উল্লেখ করেন, নিলামের কাগজের সঙ্গে জব্দকৃত মালের ওজন ও বস্তার সংখ্যায় বড় ধরনের গরমিল রয়েছে। অর্থাৎ এটি চোরাচালানের মাল—তা নিশ্চিত হয়েই মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের আটক না করে অজ্ঞাত ৩/৪ জনকে আসামি করে দায়সারা মামলা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, রাত গভীর হওয়ার পর সোবহানীঘাট ফাঁড়ি সংলগ্ন এলাকায় ছিনতাইকারী ও চোরাকারবারিদের অবাধ বিচরণ দেখা গেলেও এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেই। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও ক্ষোভ।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—একজন পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে কীভাবে তিনি অপরাধীদের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন? আর বিগত সরকারের প্রভাবশালী বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন?
উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কি এই ‘উর্দিহীন’ প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, নাকি রহস্যময় প্রভাবের আড়ালে সব অভিযোগ চাপা পড়ে যাবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়। (চলবে)
প্রকাশক ও সম্পাদক: কামরুল হাসান জুলহাস
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।