প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
সিলেটে আশ্রয়ের সম্পর্ক হয়ে ওঠেছে ভয়ংকর
সিলেট এডিশন ডেস্ক
নিজস্ব প্রতিবেদক: যে সম্পর্ক হওয়ার কথা ছিল ভরসার। বিপদসংকুল পরিস্থিতিতেও যেখানে মেলার কথা আশ্রয়। সেই ভরসা আর আশ্রয়ের সম্পর্ক হয়ে ওঠেছে ভয়ংকর। কোথাও যেন নিরাপদ নয় সম্পর্কের বাঁধন। জন্মদাতা কিংবা পিতৃতুল্য সম্পর্কিত স্বজনের হাতে ধর্ষিত হচ্ছে কন্যাসন্তান। জন্মদাত্রী হয়ে ওঠেছেন ঘাতক। তুচ্ছ ঘটনায় প্রিয়তমা স্ত্রীর ঘাতক হয়ে ওঠছেন স্বামী। একসময় ধর্মপ্রাণ ও রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার উপর গড়ে ওঠা সিলেটে এরকম ঘটনা ঘটতে কালেভদ্রে। কিন্তু হঠাৎ করে যেন ভেঙে গেছে সকল বন্ধন। চলতি মে মাসে সিলেট বিভাগে আপনজনদের হাতে ধর্ষন ও খুনের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১০টি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণেই এরকম ঘটনা ঘটছে।
সিলেটে চলতি মাসে যেসব অমানবিক ও বর্বরোচিত ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে একটি ঘটে গত ২২ মে। ওই দিন সিলেট সদর উপজেলার পুরান কালারুকা গ্রামের আমির আলীর স্ত্রী সুবিনা বেগম নিজের ২০ মাসের কন্যাসন্তানকে গলা কেটে হত্যা করেন। ওইদিন ফজরের নামাজে ছিলেন আমীর আলী। নামাজ থেকে ফিরে দেখেন ঘরে মেয়ে মাইমুনা জান্নাত তোহার রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে আছে। এ ঘটনায় পুলিশ অভিযুক্ত মা সুবিনাকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু এখনো এই হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কোন কারণ উদঘাটন হয়নি।
ওইদিন বিকেলে পার্শ্ববর্তী ঘোপাল এলাকায় ঘটে আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনা। এক কিশোরীকে বাড়ি থেকে ডেকে মাদকের এক আস্তানায় নিয়ে ধর্ষন করা হয়। আলী হোসেন নামের প্রতিবেশি এক চাচাকে তাকে ডেকে নিয়ে সালমান শাহ নামের এক যুবকের হাতে তুলে দেন। খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজন মাদকের আস্তানাটি ঘেরাও করে আলী হোসেন ও সালমান শাহ’কে আটক করে পুলিশে দেন। উপরের দুটি ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে এবং মামলার সকল আসামী গ্রেফতার হয়েছে বলে জানিয়েছেন জালালাবাদ থানার ওসি শামসুল হাবীব।
সিলেটের জৈন্তাপুরে ঘটেছে বর্বরোচিত আরও একটি ঘটনা। বাবা নামের এক নরপশুর ধর্ষনের শিকার হয়েছে ১১ বছরের এক শিশু। শিশুটির মায়ের করা মামলায় আকবর হোসেন নামের ওই নরপশুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মায়ের অভিযোগ গত ফেব্রুয়ারি থেকে ভয় দেখিয়ে শিশুটিকে একাধিকবার ধর্ষন করেছে আকবর। সর্বশেষ গত ১৯ মে ভোররাতে ফের ধর্ষনের সময় শিশুটির ঘুঙানির শব্দে মা টের পেয়ে যান। পরে পুলিশ তাকে আটক করে।
গত ৬ মে বিকেলে সিগারেট আনার কথা বলে সিলেট সদর উপজেলার সোনাতলার প্রতিবেশি চাচা জাকির হোসেন দোকানে পাঠায় ফাহিমা নামের চার বছরের এক শিশুকে। সিগারেট নিয়ে আসার পর তাকে ঘরে আটকে ধর্ষনের চেষ্টা করে। একপর্যায়ে ফাহিমা জ্ঞান হারালে তাকে শ্বাসরোধ করে খুন করে জাকির। এরপর লাশ গুমের চেষ্টা করে সে। ৮ মে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ১১ মে পুলিশ জাকিরকে গ্রেফতার করলে শিশু ফাহিমাকে ধর্ষনচেষ্টা ও খুনের কথা স্বীকার করে জাকির। সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ কোর্স
গত শনিবার সন্ধ্যায় সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালহাটা গ্রামে পারিবারিক কলহের জেরে স্বামীর শাবলের আঘাতে প্রাণ হারান ফাহমিদা আক্তার মোহনা নামের এক গৃহবধূ। এ ঘটনার পর থেকে স্বামী জাহিদুল ইসলাম আত্মগোপনে রয়েছে। তাকে গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে বলে জানিয়েছেন গোলাপগঞ্জ থানার ওসি মো. আরিফুল ইসলাম।
গত ১৫ মে সিলেটের বিয়ানীবাজারের লাউতা ইউনিয়নের দক্ষিণ পাড়িয়াবহর গ্রামে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে ফুফাতো ভাই তামিম আহমদের ছুরিকাঘাতে মামাতো ভাই সিয়াম আহমদ নিহত হন।
গোলাপগঞ্জে রবিবার (২৪ মে) সন্ধ্যায় উপজেলার ফুলবাড়ি ইউনিয়নের হেতিমগঞ্জ পূর্বপাড়া এলাকায় ঝুমকি দেব (৩০) নামের এক গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত ঝুমকি দেব ওই এলাকার চঞ্চল দাসের স্ত্রী ।নিহতের বাবা এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করেছেন।তাদের দাবি চঞ্চল দাস ঝুমকি দেবকে হত্যা করেছে। ,
সিলেটে হঠাৎ করে এই অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সমাজ-পরিবেশ গবেষক অধ্যাপক ড. মো. জহিরুল হক শাকিল বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশুর প্রতি সংগঠিত কিছু সহিংসতার ঘটনা অন্ধকার যুগকেও হার মানিয়েছে। এ ধরনের ঘটনাকে কোনো বিচ্ছিন্ন বা সরল রৈখিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। এর জন্য একক কোন কারণও দায়ী নয়। মূলতঃ সামাজিক, পারিবারিক, মানসিক, সাংস্কৃতিক, আইনি দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির একটি সম্মিলিত সংকটের কারণে এই অবক্ষয় ঘটছে। সিলেটে অতিসম্প্রতি কয়েকটি বিকৃত সামাজিক অপরাধ খুবই ঘনিষ্টজনদের মধ্যে ঘটছে। মানুষের মধ্যে যখন নৈতিকতা ও মানবিকতাবোধ বলতে কিছু থাকে না তখনই এরকম ঘটনা ঘটে। এটি একটি সামাজিক ক্ষত। এরকম অপরাধ বিকৃত মানিসকতার লোকজন অনুকরণ করে। যে কারণে দেখা যায়, কোনো একটি সময়ে আলোচিত কোন অপরাধ ঘটলে সেটি পরপরই ঘটতে থাকে। এজন্য আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় নৈতিকতাবোধ ফেরাতে হবে, পারিবারিক শিক্ষা ও বন্ধন আরও দৃঢ় করতে হবে। পাশাপাশি অপরাধীদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক: কামরুল হাসান জুলহাস
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।