প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬
ভুয়া জন্মসনদ কেলেঙ্কারিতে কাঁপছে সিসিক, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্নবিদ্ধ বাংলাদেশ
সিলেট এডিশন ডেস্ক
স্টাফ রিপোর্টার: সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) অঞ্চল-০৬ কার্যালয়কে কেন্দ্র করে সংঘটিত ভয়াবহ জন্মসনদ জালিয়াতির ঘটনা এখন জাতীয় উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশ হাইকমিশনের তদন্তে ১১টি ভুয়া জন্মসনদের তথ্য উদ্ঘাটিত হওয়ার পর দেশের নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থার নিরাপত্তা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, এ ধরনের অনিয়ম বাংলাদেশের পাসপোর্ট, ভিসা যাচাই ও জাতীয় পরিচয় ব্যবস্থার ওপর বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অভিবাসন ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি সুসংগঠিত জালিয়াত চক্র সরকারের ডিজিটাল জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্যভান্ডার ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি করে। ব্রিটিশ হাইকমিশনের যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রকাশ পায়, জন্মসনদের সঙ্গে জমা দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, ম্যানুয়াল জন্মসনদ, এমনকি অভিভাবকের পাসপোর্টসহ অধিকাংশ নথিই ছিল জাল ও মনগড়া তথ্যনির্ভর।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—প্রতিটি আবেদনে জন্মস্থান হিসেবে “সিলেট সিটি করপোরেশন” উল্লেখ করা হলেও তার পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ বা বৈধ তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। তারপরও যাচাই-বাছাই ছাড়াই সরকারি সিস্টেমে এসব আবেদন অনুমোদিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, বিডিআরআইএস নীতিমালা অনুযায়ী জন্মনিবন্ধন অনুমোদনের আগে নিবন্ধন সহকারী ও নিবন্ধকের পৃথক যাচাই বাধ্যতামূলক। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চরম অবহেলা, দায়িত্বহীনতা ও প্রশাসনিক শৈথিল্যের কারণে ভুয়া তথ্য সরকারি তথ্যভান্ডারে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
এ ঘটনায় রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় গত ২৭ এপ্রিল জারি করা এক চিঠিতে সিসিক অঞ্চল-০৬-এর নিবন্ধক ও প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম এবং নিবন্ধন সহকারী নজরুল ইসলামকে সরাসরি দায়ী করে। চিঠিতে তাদের কর্মকাণ্ডকে “জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪”-এর ২১(১) ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, দায়িত্বে অবহেলা এবং প্রশাসনিক অসদাচরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
একইসঙ্গে নিবন্ধন সহকারী নজরুল ইসলামের নিবন্ধন ক্ষমতা অবিলম্বে বাতিল করে অন্য কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে জন্মসনদ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রেজিস্ট্রার জেনারেলের নির্দেশনার পর ইতোমধ্যে সিসিক অঞ্চল-০৬ থেকে ইস্যুকৃত ১১টি জন্মনিবন্ধন স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম-ঠিকানাও প্রকাশ করা হয়েছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় সরকার বিভাগসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অতীতে বিচ্ছিন্নভাবে জন্মসনদ জালিয়াতির অভিযোগ উঠলেও এবারই প্রথম কোনো বিদেশি মিশনের অনুসন্ধানে বড় পরিসরে এমন জালিয়াতি প্রকাশ্যে এলো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জন্মসনদ কেবল একটি স্থানীয় সনদ নয়; এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নাগরিক পরিচয় যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ফলে এ ধরনের জালিয়াতি আন্তর্জাতিক ভিসা প্রক্রিয়া, অভিবাসন ব্যবস্থা ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তারা ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার, বহুমাত্রিক তথ্য যাচাই, নিয়মিত অডিট এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “সংঘবদ্ধ একটি প্রতারক চক্র ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে জাল কাগজপত্র দাখিল করে জন্মনিবন্ধন সংগ্রহ করেছে। বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সনদ বাতিল করা হয়েছে এবং রেজিস্ট্রার জেনারেলের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অনিয়ম আর না ঘটে, সেজন্য অধিক সতর্কতা ও কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।”
প্রকাশক ও সম্পাদক: কামরুল হাসান জুলহাস
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।