প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
গোয়াইনঘাটে আশরাফুলের ঘুযের সাম্রাজ্য : বদলি -হয়রানি-ওয়াস ব্লকসহ ২৫ অভিযোগ,কোটি টাকা বাণিজ্য
সিলেট এডিশন ডেস্ক
বিশেষ প্রতিনিধি : সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা দুর্নীতি, ঘুষ-বাণিজ্য, শিক্ষক হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গোয়াইনঘাট উপজেলার সাবেক সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আশরাফুল আলম। তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম, বদলি বাণিজ্য, উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন আদায়, নারী শিক্ষকদের যৌন হয়রানি এবং সাংবাদিক ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে।অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শেষ করেছে। জানা গেছে, গত ৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ভুক্তভোগী শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর ২৫ দফা লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। পরে ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে অধিদপ্তরের শিক্ষা অফিসার (সাধারণ প্রশাসন) জিয়া উদ্দিন আহম্মদ গোয়াইনঘাট উপজেলা শিক্ষা অফিসে এসে তদন্ত পরিচালনা করেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সাল থেকে টানা সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে গোয়াইনঘাটে দায়িত্ব পালনকালে আশরাফুল আলম একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি দায়িত্ব পালনের বিধান থাকলেও নানা কৌশলে তিনি একই উপজেলায় বহাল থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় শিক্ষক বদলি, মাতৃত্বকালীন ছুটি, অবৈধ সংযুক্তি, পদোন্নতি, এসিআর, প্রশিক্ষণ, উন্নয়ন প্রকল্প ও স্কুল পরিদর্শন—সবকিছুকেই ঘুষ আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন করে আলোচনায় এসেছে পিডিপি-৪ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্মিত ওয়াস ব্লক প্রকল্প। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি প্রকল্পে ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও অধিকাংশ কাজ নিম্নমানের করা হয়। অথচ প্রধান শিক্ষকদের বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করা হতো। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই প্রকল্প থেকেই প্রায় অর্ধকোটি টাকার ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্য হয়েছে। শুধু ওয়াস ব্লক নয়, বিভিন্ন বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর ও ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনসহ অন্যান্য উন্নয়ন কাজ থেকেও বড় অঙ্কের কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, আন্তঃউপজেলা ও অন্তঃউপজেলা বদলিকে তিনি ঘুষ আদায়ের অন্যতম বড় খাতে পরিণত করেন। বিভিন্ন শিক্ষকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এক নারী শিক্ষিকার বদলির বিনিময়ে গরু ও মালয়েশিয়া ভ্রমণের রিটার্ন টিকিট দাবি করার অভিযোগও উঠেছে। দাবি পূরণ না করায় তাকে বদলি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতিটি স্কুল পরিদর্শনের পর প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে মোটরসাইকেলের তেলের খরচের কথা বলে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনের নামেও ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। লিখিত অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নারী শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও চাকরির নিরাপত্তার প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা। এতে রাজি না হলে মানসিক নির্যাতন ও প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।এমনকি যৌন হয়রানির কারণে এক নারী শিক্ষক চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুললেই কিছু সাংবাদিককে ব্যবহার করে লাইভ প্রচার, অপপ্রচার ও সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হতো। ফলে দীর্ঘদিন অনেক শিক্ষক আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন।
২৫ টি লিখিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে বর্তমানে ওসমানী নগরে কর্মরত শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুল আলম এর ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে
তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, বেনামে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে আমাকে হয়রানি করতে। অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি কৌশলে নীরবতা পালন করেন।
অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্ত কর্মকর্তা শিক্ষা অফিসার (সাধারণ শাখা) জিয়া উদ্দিন আহম্মদ বলেন,“লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সঠিকভাবে তদন্ত করা হয়েছে। চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক( তদন্ত ও শৃঙ্খলা শাখা) মো: আব্দুস সালাম এর ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, আমি অফিসের বাহিরে অভিযোগ দেখে বিস্তারিত বলতে হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক: কামরুল হাসান জুলহাস
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।