প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৫
সিলেট এডিশন ডেস্ক
ক্রাইম প্রতিবেদক:: বৃহত্তর সিলেটে চোরাই মোবাইল সিন্ডিকেটের রাজা ও গডফাদার শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ। ছিনতাই, চুরি হওয়া সকল দামী মোবাইলের খরিদদার তিনি। আর এসব করছেন একটি ব্যবসায়িক সাইনবোর্ড ব্যবহার করে। ব্যবসা করলেও তাকে এক নামে সিলেটের মানুষ চিনে তা হলো মোবাইল শহীদ। কোন মোবাইল ছিনতাই বা চুরি হলে লোকমূখে শোনাযায় শহিদের নাম। তাদের এমন ধারণা জন্মেছে যে, শহীদের কাছে গেলেই আপনার হারানো, চুরি হওয়া বা ছিনতাই হওয়া মোবাইল পাওয়া যাবে।
কে এই শহীদ, কি তার পরিচয়?
তিনি মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার সনকাঁপন গ্রামের বাসিন্দা মৃত নীল মিয়ার ছেলে শহীদ। বর্তমানে সিলেট মহানগরীর দক্ষিণ সুরমা থানার শীববাড়ী এলাকায় জমি কিনে আলিশান বাড়ী বানিয়ে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছন।
বিগত ১৫ বছর আগেও শহীদ সিলেট নগরীর দক্ষিণ সুরমার কদমতলী বাসটার্মিনাল এলাকায় তাহার বাবা নীল মিয়ার সাথে কলোনীতে ভাড়া বাসা নিয়ে বসবাস করতো। জীবিকা নির্বাহ করতে নীল মিয়া কাজিরবাজার থেকে মাছ কিনে বাসায় বাসায় ফেরি করে বিক্রি করতো। তখন শহীদ পুলেরমোখ ও কদমতলীতে পলিতিন ফেরি করে বিক্রি করতো। পলিতিন বিক্রির পাশা-পাশি জড়িয়ে পরে মোবাইল চোর, ছিনতাইকারী সিন্ডিকেটের সাথে। রাতারাতি হয়ে যায় মোবাইল চোর,ছিনতাইকারীদের নেতা। তার নির্দেশে নগরীর দক্ষিণ সুরমা ও উত্তর সুরমায় গড়ে উঠে বিশাল বড় মোবাইল ছিনতাই চক্রের সিণ্ডিকেট। বর্তমানে এই সিন্ডিকেটের পরিধি বৃদ্ধি পেয়ে বৃহত্তর সিলেটের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটিকর্পোরেশন ছাড়িয়ে পাড়া মহল্লায় বিস্তৃতি লাভ করেছে। এই চক্রের গডফাদার ও রাজা মোবাইল শহীদ।
সে কয়েক বছরে আলাদিনের ছেরাগের মতো অর্ধশত কোটি টাকার মালিক হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এখন তাকে পালসার শহীদ নামেও স্থানীয়রা ডেকে থাকেন। মাসে মাসে পালসার মোটরসাইকেল বদল করার কারনে নতুন এই নাম ডাক।
আরো খোজঁ নিয়ে জানাযায়, সিলেট নগরীর বন্দর বাজার এলাকার করিম উল্লাহ মার্কেটের তৃতীয় তলায় শহীদের একটি মোবাইল ফোনের দোকান ছিলো, কিন্তু তাহার অপকর্মের কারণে কিছুদিন আগে করিমউল্লাহ মার্কেট থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়। এছাড়াও দক্ষিণ সুরমার হুমায়ুন রশীদ চত্ত্বর এলাকায় তাহার ভাই বিকাশ,নগদ,উপায়ের লেনদেনসহ ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা করছে, এছাড়াও সিলাম, জালাপুর ও গহরপুর বাজারে মোবাইলের দোকান রয়েছে।
করিমউল্লাহ মার্কেটে মোবাইল দোকানের আড়ালে চলছিলো শহীদের অবৈধ ভারতীয় চোরাই মোবাইলের রমরমা বাণিজ্য, এখন সে সরাসরি সিলাম, জালালপুর,মোগলাবাজার ও গহরপুর কেন্দ্রীক চোরাই মোবাইলের ব্যবসা করছে বলে একটি সুত্র জানিয়েছে। বিশেষ করে গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ , কানাইঘাট, জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পার হয়ে ভারতীয় চোরাচালানের মোবাইল আসে শহিদের কাছে। আর একই সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের যতো দামী চুরি, ছিনতাইয়ের মোবাইল আছে তা ভারতে পাচার হয় শহীদের মাধ্যমে। পাচারের আগে মোবাইলে দেওয়া হয় ফ্ল্যাশ, পরিবর্তন করা হয় আইএমইআই নম্বর। চোরাই মোবাইল হস্তান্তর হয় পারাইরচক প্রগতি পেট্টোল পাম্পের সামনে। শহীদের বিরুদ্ধে সিলেট কোতোয়ালীসহ বিভিন্ন থানায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি,চোরাচালানসহ ১০টি মামলা রয়েছে। তার মধ্যে দুটি থেকে খালাস পেয়েছে, এখনো ৮টি মামলা চলমান রয়েছে।
প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের সাথে শহীদের রয়েছে হটলাইন সম্পর্ক। অপরিচিত কোন ব্যাক্তি শহীদের মুঠোফোনে কল করলে, যিনি কল করেছেন তাহার মোবাইলে ১০ মিনিটের মধ্যে ফিরতি কল আসে প্রশাসনের পরিচয়ে, কখনও RAB কখনো ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাস করা হয় কেন কল করা হয়েছে, কি পরিচয় বা কি দরকার এমন ইত্যাদি প্রশ্ন।
এস আই পদমর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তার সাথে সরাসরি আলাপ হলে তিনি দূ:খের সাথে এই প্রতিবেদককে বলেন, মোবাইল শহীদ বা মহিলা ছিনতাই কারী পপিকে আটক বা গ্রেফতার করে কোন লাভ নেই বরং লস। এদের হাত অনেক লম্বা, যে পুলিশ তাদের আটক বা গ্রেফতার করবে সেই পুলিশ এক সপ্তাহের মধ্যে সিলেট থেকে বদলী হয়ে যাবে। তাই কোন পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করতে সাহস করেনা।
মোবাইল চুরি- ছিনতাইয়ের মূল স্পট নগরীর বাসটার্মিনাল, কদমতলী, চাঁদনীঘাট, রেলওয়ে স্টেশন , হুমায়ুন চত্ত্বর, বন্দরবাজার, ধোপাদিঘীর পাড়,সুরমা মাকেট, তালতলা, শেখঘাট, বেতেরবাজার, জিন্দাবাজার,আম্বরখানা, টিলাগড়, মদিনামার্কেট, টুকের বাজার, বিমানবন্দর, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কাজিরবাজার, মহাজনপট্টি, কাস্টঘর, শিবগঞ্জ, উপশহর, মেজরটিলা, চন্ডীপুল, কাজিটুলা, শাহীঈদগাহ,চৌকিদিকি, বাদামবাগিচা, সুবিদবাজার, খাসদবি, ইলেকট্টিক সাপ্লাই,পাঠানটুলা রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নর্থইষ্ট মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়, ফাঁকা রাস্তা, অফিস-আদালত, কমিউনিটি সেন্টার এমনকি বাসাবাড়ি থেকে মোবাইল ফোন ছিনতাই বা চুরি হচ্ছে। মোবাইল ফোনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকায় অনেকে দিশাহারা হয়ে পড়ছেন।
স্থানীয় এক প্রত্যেক্ষদর্শী এই প্রতিবেদককে বলেন শহীদ প্রতি রাতে কতো মানুষকে টাকা দেয় তা বলা মুশকিল।তার তেলেসমাতি কারবার বুঝা খুবই কঠিন। সে চোরাই মোবাইলের ব্যবসা না করলে কেনো,প্রশাসন, সাংবাদিক, সোর্স, রাজনৈতিক নেতাদের টাকা দেয়।
শহীদের অপকর্মের বিষয়ে জানতে এসএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া'র) সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন মোবাইল কত পার্সেন্ট উদ্ধার হচ্ছে সেটা বলা যাবেনা,তবে মোবাইল সচল থাকলে শতভাগ আমরা উদ্ধার করতে পারবো। মূল বিষয় হচ্ছে চুরি বা ছিনতাইয়ের মোবাইল ফ্লাশ দেওয়া,বন্ধ রাখা, এমন কি পরিবর্তন করা হয় আইএমইআই নম্বর। যার কারণে মোবাইল উদ্ধার করতে দেরী হয়।দামী মোবাইল হলে দেশের বাহিরে পাচার করা হয়। তিনি আরো বলেন মোবাইল শহীদ ও ছিনতাইকারী পপির বিষয়ে তথ্যদিন দেখবো তাদের হাত কতো লম্বা।
এসব খোয়া যাওয়া ফোন খুব অল্প লোকই ফেরত পাচ্ছেন। অধিকাংশ ফোন ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। ফোন ছিনতাই বা চুরির সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি হাত বদল হয়ে যায়। প্রথমেই চক্রের সদস্যরা মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন। এরপর সিম ফেলে দিয়ে মোবাইল ফোনটি ফ্ল্যাশ দেন। দামি ফোন হলে ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি (আইএমইআই) নম্বর পরিবর্তন করে ফেলেন। এরপর মোবাইল ফোনগুলো বিভিন্ন দামে বাজারে বিক্রি করে দেন। অনেক সময় দামি ফোনগুলো দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এসব বিষয়ে জানতে মোবাইল শহীদের মুঠোফোনে কল করলেও তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন হাজার পরিবারকে ভরণপোষণ করেন, ১০ মামলার মধ্যে ৮ টি চলমান রয়েছে দূটি থেকে মুক্তি পেয়েছেন বলে স্বীকার করেন।