প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ মে ২০২৬
‘আমার ভাই, ভাইরে... আমার মার পেটের আপন ভাই
সিলেট এডিশন ডেস্ক
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার নূর সালামের ছেলে ফরিদুল (৩৫) । তিন সন্তান আর স্ত্রী নিয়ে সিলেটে থাকতেন। পেশায় নির্মাণশ্রমিক হলেও বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে ধান কাটার কাজ করতে গ্রামে চলে যেতেন। কারণ ধান কাটলে ভালো ‘রোজ’ (মজুরি) পাওয়া যায়। তাই প্রতি বারের মতো এবারও তিনি তার বাড়ি দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া নূর নগর এলাকায় যান। সেখানে গিয়ে তার ভাই শফিকুলের জমির কিছু ধান কাটেন। কিন্তু গত কয়েকদিন আগে সুনামগঞ্জের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে বেশ কিছু হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যায়। পানির নিচে ধান তলিয়ে যাওয়ায় জীবিকার তাগিদে গত শনিবার ফিরে আসেন পুরনো পেশায় যোগ দিতে।
গত রবিবার তিনি একটি বাড়ির ছাদ ঢালাই কাজ করার জন্য অন্য সব শ্রমিকের সঙ্গে সিলেটের আম্বরখানা থেকে একটি ডিআই পিকআপে উঠে লালাবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মারা যান ফরিদুল। তার বড় ভাই শফিকুল সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ মর্গে বসে কখনো বিলাপ করছিলেন, কখনো ফুঁপিয়ে ফঁটিয়ে কাঁদছিলেন। ‘ধান তো নাই, যাইগি সিলেট’ বলেই ফরিদুল ধান কাটা শ্রমিক পেশা থেকে নির্মাণশ্রমিকের পেশায় ফিরেছিলেন।
এভাবে কেবল ফুরিদুল নন, তার সঙ্গে নির্মাণশ্রমিক আরও সাতজন গত রবিবার সকালে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে মারা গেছেন। তাদের মধ্যে দুই ভাই ও দুজন নারীশ্রমিক রয়েছেন। নারীশ্রমিক ছাড়া সবাই ধান কাটা ফেরত নির্মাণশ্রমিক। সিলেট থেকে ডিআই পিকআপভ্যানে করে লালাবাজার যাচ্ছিলেন তারা। আহত হয়েছেন আরও ৬ জন শ্রমিক। এরমধ্যে একজন নারীশ্রমিকও রয়েছেন।
নিহতরা হলেন, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার ইদ্রিস আলীর স্ত্রী নার্গিস (৪৫), সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শিবপুর গ্রামের কুঠির বিশ্বাসের ছেলে পান্ডব বিশ্বাস (৩০), সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বশির মিয়ার মেয়ে মুন্নি মনি (৩৫), সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মৃত ফকরুল আলীর ছেলে সুরুজ আলী (৫০), সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পুটামারা গ্রামের সুজাত আলীর ছেলে বদরুল জামান (৪০), সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার নূর সালামের ছেলে ফরিদুল (৩৫)। সুনামগঞ্জ উপজেলার বিশম্বরপুর উপজেলার আজির উদ্দিন (৩০) ও তার ভাই আমির উদ্দিন (৪০)। জেলাপরিচিতি
আহত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রফিক মিয়ার ছেলে আলমগীর, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মল্লিক মিয়ার ছেলে আফরোজ মিয়া, একই এলাকার মৃত শুক্কুর উল্লাহর ছেলে তুরাব উল্লাহ, মৃত আলীম উদ্দিনের ছেলে রামিন, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার লাবু বেগম, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পুটামারা গ্রামের বদরুজ্জামানের স্ত্রী হাফিজা বেগম। লাবু বেগমের এক হাতের কবজি ওড়ে গেছে।
নিহত ও আহত শ্রমিকদের সহকর্মী ও আত্মীয়রা জানান, রবিবার ভোর ৬টায় সিলেটের লালাবাজার এলাকায় ঢোলাই কাজে যাওয়ার জন্য নগরীর আম্বরখানা থেকে একটি ডিআই পিকআপ ভ্যানে করে রওয়ানা দেন প্রায় ১৫ জন শ্রমিক। ভোর ৬টা ২৫ মিনিটের দিকে শ্রমিকবাহী পিকআপটিকে ও বিপরীত দিক থেকে আসা একটি কাঁঠালবোঝাই ট্রাক ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান চারজন। বাকি চারজন মারা যান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়।
ট্রাকটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে বলে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) মনজুরুল আলম। তিনি বলেন, কাঁঠালবোঝাই ট্রাক ও শ্রমিকবাহী ডিআই ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। এতে চারজন ঘটনাস্থলে ও চারজন হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তারা সিলেট ওসমানী মেডিকেলে চিকিৎসাধীন আছেন। দুর্ঘটনার পরপরই দুই গাড়ির চালক পালিয়ে গেছে।
দুর্ঘটনাটি সড়কপথের মৃত্যুবিভীষিকা বলে মন্তব্য করেন প্রতক্ষদর্শীর রনজিৎ তালুকদার। তিনি একজন পুলিশ সদস্য। গত শনিবার সিলেটে প্রধানমন্ত্রীর সফরকালীন নিরাপত্তায় দায়িত্বে থাকা এসএসএফ সদস্যদের প্রটোকলের দায়িত্বে ছিলেন। পথিমধ্যে তার চোখের সামনে এই দুর্ঘটনা ঘটে। রনজিৎ তেলিবাজার এলাকায় মারকাজ পয়েন্টের পাশে যে গ্যাস পাম্পটা আছে। ওই গ্যাস পাম্প আর ব্রিজে ওঠার আগে মধ্যখানে ঠিক বাম সাইডে পিকআপকে কাঁঠাল বুঝাই ট্রাক ধাক্কা দেয়। ট্রাকের চালক সামনের ডান সাইড দিয়া পিকাপের পিছনে ধাক্কা দেয়। তখন পাখির বাচ্চার মত ৮ থেকে ৯ জন লোক পিকআপ থেকে ছিটকে পড়ে যায়। তাদের মধ্যে দুইজন মহিলা ছিলেন। আমি তাড়াতাড়ি গাড়ি আটক করে তৎক্ষণাৎ ৯৯৯ এ কল দিয়ে দক্ষিণ সুরমা থানাকে অবগত করি। তখন থানার সদস্যরা আমাকে কুইক রেসপন্স করে ঘটনাস্থলে আসে। আমার মনে হয়েছে ট্রাকের চালক ড্রাইভার ছিল না। হেলপার গাড়ি চালাচ্ছিল। তার চোখ দেখে মনে হয়েছে ঘুম ছিল।
হতাহতের মধ্যে শ্রমিক দম্পতিও রয়েছে। আহত খাদিজা স্বামীকে হারিয়েছেন। খাদিজার স্বামীর নাম বদরুল (৩০)। এ দম্পতি সিলেটের জালালাবাদ থানায় বসবাস করেন। খাদিজা জানান, তার স্বামীও ধান কাটায় ছিলেন। কিন্তু ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নির্মাণশ্রমিকের কাজে ফেরেন। ঢালাই কাজে সাধারণত দলবেঁধে একসঙ্গে শ্রমিকেরা অনেকটা উৎসবমুখরতায় যান। এ যাত্রায় ঘটে দুর্ঘনাটি। খাদিজা-বদরুলের পরিবারে তিন ছেলে ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে। তিনি মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত। জ্ঞান ফিরলে কেঁদে ওঠেন। আবার জ্ঞান হারান।
আহত নারীশ্রমিক লাবু বেগম ডান হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়েছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের বাসিন্দা তিনি। শ্রমজীবী স্বামীর পাশাপাশি লাবু বেগমই ছিলেন পরিবারের অন্যতম উপার্জনক্ষম সদস্য। যে হাত দিয়ে কাজ করেন, সেই হাত নেই-এ বিষয়টি লাবু বেগমকে জানানো হয়নি বলে জনিয়েছেন তার স্বজনেরা।
আহতদের চিকিৎসা সম্পর্কে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির বলেন, দুর্ঘটনায় আহত রয়েছেন তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থাটা আমরা আগে করছি। সবার আগে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা তারপর প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসার জন্য যা করা প্রয়োজন সবই করা হবে।
ধান কাটাফেরত শ্রমিক ফরিদুলের মরদেহ সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ মর্গে খোঁজার সময় এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় শফিকুলের। সারিবদ্ধ করে রাখা আটটি মরদেহ। সেখানে নিজের ভাইয়ের মরদেহ দেখিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। বিলাপ করে করছিলেন, ‘আমার ভাই, ভাইরে... আমার মার পেটের আপন ভাই! তার তিনটা বাচ্চা। দিন আনে দিন খায়। খুব কষ্ট করে। ধান কাটা গেছিল। ধান কাইট্টা আইছে কালকে (শনিবার) সিলেট। সিলেটে তার পরিবার থাকে। আমার খেতের ধান কাইট্টা আইছে। সিলেট না আইলেতো সংসার চালাইতে পারত না। আমারে শেষ কথা কইছে, ভাই ধান তো কাটার মতো নাই, আমি যাইগি সিলেট। আমি কইছি আল্লারে ইয়াদ কইরা যা। সকাল সাতটায় জানছি তার মরার খবর। জানার পর আর আমার জানো পানি নাই। আমার ভাই কইরে... আমার ভাই!’
শফিকুল জানান, নিহত ফরিদুলের তিনটি সন্তানই ছোট। বড় ছেলে ১০ বছর। তাই তাদের সংসারের হাল ধারার মতো কেউ নাই। ভাই হারানোর শোকের পাশাপাশি তিনটি ছোট বাচ্চা নিয়ে ফরিদুলের স্ত্রী কিভাবে জীবনযাপন করবেন সেই চিন্তায় আছেন শফিকুল।
প্রকাশক ও সম্পাদক: কামরুল হাসান জুলহাস
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।