প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬
সুনামগঞ্জে একের পর এক ভাঙছে বাঁধ ডুবছে হাওরের ফসল কাঁদছে কৃষক
স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জের হাওরে একের পর এক ভাঙছে ফসলরক্ষা বাঁধ| তাতে হাওরবাসীর সংকট আরও বেড়েছে| শনিবার সকালে বাঁধ ভেঙে মধ্যনগরের বোয়ালা হাওরের ফসল ডুবছে| হাওরে ডুবে যাওয়া ধান কাটবেন, না কী বাঁধ রক্ষা করবেন এই সংকটে পড়েছেন কৃষকরা| দিশেহারা হয়ে কৃষকদের অনেকেই আশা ছেড়ে কেবল হা হুতাশ করছেন| প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার ভোর থেকে বৃষ্টিপাত হয়েছে সুনামগঞ্জে ও মধ্যনগরে| তাতে সোমেশরী নদীর পানি বেড়ে মধ্যনগর জামে মসজিদের পাশের কালভার্টের সামনের পাউবো’র দেওয়া বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ শুরু হয়| সকালে যারা এই হাওরে ধান কাটতে গিয়েছিলেন, এই কৃষকরা কান্নাকাটি শুরু করেন|
আশপাশের কৃষক ও প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও ভাঙনের তীব্রতা ঠেকাতে পারেন নি| স্থানীয় কৃষকরা বাঁধের এই ভাঙনের জন্য পাউবো ও তাদের নিয়োজিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসির) লোকজনকে দোষারোপ করেছেন| পানির প্রবল বেগ দেখে আশা ছেড়ে দিয়েছেন শত শত কৃষক|
উপস্থিত কৃষক ও কৃষাণিরা বলেছেন, বাঁধের কাজে অবহেলা ছিল| কালভার্টের মুখের এই বাঁধে আড়-প্যালাসেটিং কিছুই দেওয়া ছিল না|
মদ্যনগর গ্রামের কৃষক মুরাদ মিয়া জানালেন, তার ১৭ কেয়ার জমি কাটার বাকী ছিল| শনিবার সকালে ধান কাটা শ্রমিক নিয়ে হাওরে গিয়েছিলেন| এসময় বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় ফসল|
মধ্যনগর ইউনিয়ন কৃষি উপ-সহকারী কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেছেন, হাওরে ২০ হেক্টরের মত জমির ধান কাটা হয় নি| এগুলো ডুবে গেছে| পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেছেন, হাওরের ধান কাটা শেষ হয়ে গেছে| এমন সময় বাঁধও ভেঙেছে| এজন্য বাঁধ ঠেকানোর চেষ্টা করা হয় নি|
এর আগে শুক্রবার ভোররাত থেকে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার কাইল্যানীতে বাঁধের ওপর দিয়ে পানি উপচে পড়া শুরু হয়েছে। এর ফলে শালদিঘা হাওরের হাজারো কৃষক এখন চরম দুশ্চিন্তা ও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাইল্যানী উপ-প্রকল্পের ২০ নম্বর পিআইসির (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভোররাতে পানি উপচে পড়ার পর পানির প্রবল চাপে ধীরে ধীরে বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে যেতে শুরু করে, যার ফলে হাওরে পানি প্রবেশ করছে।
উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও কৃষকরা বিকাল পর্যন্ত (বিকাল ৪টা) বাঁধটি রক্ষায় কাজ করছিলেন। শালদিঘা হাওরের কৃষক নিরঞ্জন সরকার বলেন, “হাওরের অর্ধেকের বেশি জমির ধান এখনো কাটা হয়নি। যদি বাঁধটি আটকানো না যায়, তাহলে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব।” একই এলাকার কৃষক রনি তালুকদার বলেন, “টানা বৃষ্টির কারণে ধান কাটতে পারছি না, কাটলেও শুকাতে পারছি না। এর মধ্যে আবার বাঁধ রক্ষার কাজ করতে হচ্ছে। আমরা এখন চরম বিপদে আছি।”
উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, পাউবোর এসও ও পিআইসি সভাপতির যোগসাজশে বাঁধে দুর্নীতি হয়েছে। বাঁধের উচ্চতা কম হয়েছে, স্লোপ কম ছিল। এ কারণে হাওরের সর্বনাশ ঘটেছে। তিনি বলেন, এই বাঁধের অন্য অংশের চেয়ে এই অংশ নিচু হয়েছে। এ কারণে সোমেশ্বরী নদীর পানি বাড়তেই এদিক দিয়ে পানি উপচে গেছে। একপর্যায়ে বাঁধটি ভেঙে গেছে।
মধ্যনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল বাশার বলেন, সকালে বাঁধের ভাঙনের খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে ৩০-৩৫ জন শ্রমিককে কাজে লাগিয়েছি। স্থানীয় কৃষকরাও চেষ্টা করছেন। পিআইসির সভাপতি লাল মিয়াকে কমপক্ষে ১০০টি ফোন দেওয়ার পরে রিসিভ করে বললেন, সাড়ে নয়টায় আসবেন। কিন্তু বিকাল ৪টা পর্যন্ত তার খোঁজ নেই।
পিআইসির সভাপতি মো. লাল মিয়া চামরদানি ইউনিয়ন বিএনপির চার নম্বর ওয়ার্ডের সেক্রেটারি। সাংবাদিকদের তিনি জানান, টানা বৃষ্টির কারণে মাটি ক্ষয় হয়ে বাঁধটি নিচু হয়ে যায়। বাঁধ রক্ষার জন্য সারারাত ঘটনাস্থলে ছিলাম। সকাল থেকে অন্য পাশে কাজ করতে হচ্ছে। এজন্য সেখানে যেতে পারিনি।
প্রকাশক ও সম্পাদক: কামরুল হাসান জুলহাস
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।