প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জকিগঞ্জের হাওরে যুক্তরাজ্য প্রবাসীর পুড়া লাশ ঘিরে অজানা প্রশ্ন
সিলেট এডিশন ডেস্ক
জকিগঞ্জের হাওরে যুক্তরাজ্য প্রবাসীর পুড়া লাশ ঘিরে অজানা প্রশ্ন
হাসান জুলহাস:: নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় সীমান্তঘেঁষা এক হাওর থেকে আগুনে পোড়া লাশ উদ্ধার—ঘটনাটি শুধু একটি মৃত্যুর খবর নয়, বরং এর প্রতিটি আলামত জন্ম দিচ্ছে একের পর এক প্রশ্নের। সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার কোনারবন্দ হাওরে উদ্ধার হওয়া এই মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ। নিহত ব্যক্তি যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বুরহান উদ্দিন (৫৯)।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এটি কি নিছক একটি হত্যা, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো ষড়যন্ত্র?
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বুরহান উদ্দিন গত ৩০ জানুয়ারি সিলেট নগরের বিমানবন্দর থানা এলাকা থেকে নিখোঁজ হন। সেদিন তিনি সিলেট থেকে কুলাউড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন বলে পরিবার জানায়। এরপর থেকেই তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। কোনো যোগাযোগ, কোনো সন্ধান—কিছুই মেলেনি।
নিখোঁজের ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—নিখোঁজের পরপরই অনুসন্ধান কতটা সক্রিয় ছিল? শেষবার তিনি কার সঙ্গে ছিলেন, কোন যানবাহনে উঠেছিলেন—সেসব তথ্য কি তখনই সংগ্রহ করা হয়েছিল?
মঙ্গলবার দুপুরে জকিগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের সাতঘরি ও বিলপার এলাকার মধ্যবর্তী কোনারবন্দ হাওর থেকে স্থানীয়রা একটি লাশ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেন।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে যে আলামত পায়, তা কোনো সাধারণ মৃত্যুর ইঙ্গিত দেয় না—
লাশটি আগুনে পোড়া,একটি পায়ে দড়ি বাঁধা, গলায় কাপড় প্যাঁচানো,পাশে পাওয়া গেছে একটি লবণের প্যাকেট, এই চারটি আলামত একসঙ্গে কী বোঝায়?
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, আগুনে পোড়ানো সাধারণত পরিচয় গোপন বা আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে করা হয়। দড়ি ও গলায় কাপড় থাকার বিষয়টি শ্বাসরোধ বা নির্যাতনের সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করে। আর লবণের প্যাকেট—এটি কি দুর্গন্ধ কমানোর চেষ্টা, নাকি পরিকল্পিত হত্যার অংশ?
লাশটি এতটাই বিকৃত ছিল যে চেহারা দেখে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও সিআইডি আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে পরিচয় নিশ্চিত করে।
জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক জানান, সুরতহাল শেষে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত চলছে।
তবে এখনো অস্পষ্ট— হত্যা কোথায় সংঘটিত হয়েছে?
হাওরে এনে লাশ পোড়ানো হয়েছে, নাকি অন্য কোথাও হত্যা করে এখানে ফেলে দেওয়া হয়েছে?
হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তি জড়িত কি না?
নিহত বুরহান উদ্দিন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর তিনি দেশে অবস্থান করছিলেন এবং সিলেট নগরের আম্বরখানা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।
প্রশ্ন উঠছে—দেশে থাকা অবস্থায় তিনি কি কোনো আর্থিক বিরোধে জড়িয়েছিলেন? সম্পত্তি, জমি, পারিবারিক বিরোধ বা ব্যবসায়িক লেনদেন—কোনো বিষয় কি এই হত্যার সঙ্গে যুক্ত? তাঁর প্রবাসী পরিচয় কি তাঁকে টার্গেটে পরিণত করেছে?
কোনারবন্দ হাওর এলাকা জকিগঞ্জ সীমান্তসংলগ্ন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের নির্জন হাওর এলাকাগুলো অনেক সময় অপরাধ সংঘটনের পর লাশ ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—
এই এলাকা কি আগে এমন ঘটনার সাক্ষী?
অপরাধীরা কি ভৌগোলিক দুর্বলতাকে কাজে লাগাচ্ছে?
অনুসন্ধানে যেসব প্রশ্ন সামনে এসেছে—
বুরহান উদ্দিনকে শেষ কারা দেখেছে?
তিনি যে পথে কুলাউড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন, সেই রুটে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে কি?
তাঁর মোবাইল ফোন ও ব্যক্তিগত সামগ্রী কোথায়?
এটি কি পরিকল্পিত হত্যা, নাকি অপহরণের পর হত্যা?
নিখোঁজের পাঁচ দিন পর আগুনে পোড়া লাশ—এই মৃত্যু কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। প্রতিটি আলামত বলছে, এটি একটি পরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড।
ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও তদন্তের অগ্রগতি হয়তো অনেক প্রশ্নের উত্তর দেবে। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত বুরহান উদ্দিনের মৃত্যু শুধু একটি সংবাদ নয়—এটি আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের সক্ষমতা নিয়ে বড় এক প্রশ্নচিহ্ন।
প্রকাশক ও সম্পাদক: কামরুল হাসান জুলহাস
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।