উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেট নগরীর দক্ষিণ সুরমা থানায় একটি পারিবারিক সম্পত্তি বিরোধকে কেন্দ্র করে দায়ের করা চাঁদাবাজির মামলায় এক স্থানীয় সাংবাদকর্মীকে গ্রেফতার ও দ্রুত আদালতে সোপর্দ করার ঘটনায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কোনো প্রকার তদন্ত ছাড়াই মামলাটি আমলে নিয়ে সাংবাদকর্মীকে আটক করা হয়েছে, যা পুলিশের নিরপেক্ষতা ও পেশাগত দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
গ্রেফতার হওয়া সাংবাদকর্মীর নাম সালমান জামান। তিনি স্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল তালাশ টিভি ডট লাইভ-এর স্টাফ রিপোর্টার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশের একটি দল এসআই গৌতমের নেতৃত্বে নগরীর বড়ইকান্দি এলাকার ১ নম্বর রোডে সালমান জামানের বাসায় অভিযান চালায়। সে সময় তিনি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন।অভিযোগ রয়েছে, তাকে মুখ ধোয়া বা পরিধেয় কাপড় পরার সুযোগ না দিয়েই টেনে-হিঁচড়ে একটি হত্যা মামলার আসামির মতো করে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়। এ সময় তার দুই ছোট মেয়ে কান্নাকাটি করলেও পুলিশ সদস্যদের মানবিক কোনো আচরণ দেখা যায়নি বলে দাবি পরিবারের।
আটকের পরপরই দুপুর ২টার আগেই সালমান জামানকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। এদিকে গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়লে সহকর্মী সাংবাদিকরা দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে একাধিকবার যোগা- যোগের চেষ্টা করেন। তবে ওসির ব্যবহৃত সরকারি মোবাইল নম্বর দীর্ঘ সময় বন্ধ পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় সাংবাদিক মহলে ধারণা জন্ম নেয়—কোনো প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সমঝোতার কারণে ওসি ইচ্ছাকৃতভাবে ফোন বন্ধ রেখেছিলেন, যাতে কোনো ধরনের তদবির বা প্রশ্নের মুখোমুখি না হতে হয়।
পরে রাতে ওসি (তদন্ত)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ওসির পক্ষে বক্তব্য দিয়ে জানান, “পারিবারিক চাঁদাবাজির মামলায় সালমান জামানকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মামলার বাদী নোমান আহমদ—যিনি সালমান জামানের আপন ভাই—এর বিরুদ্ধে ১৫–২০ দিন আগে দক্ষিণ সুরমা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন সালমান জামান। ওই জিডিতে অভিযোগ ছিল, নোমান আহমদ রামদা হাতে তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে গালাগালি করেন। ঘটনার ভিডিও ফুটেজও সংরক্ষিত আছে। অভিযোগ রয়েছে, আজ পর্যন্ত ওই জিডির কোনো তদন্ত হয়নি। অথচ ৬ জানুয়ারি দায়ের করা চাঁদাবাজির মামলাটি কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই রেকর্ড করে মাত্র দুই দিনের মাথায় সাংবাদকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—একটি পারিবারিক বিরোধ কেন হঠাৎ চাঁদাবাজির মামলায় রূপ নিল?
তদন্ত ছাড়াই কেন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হলো?
আগের জিডির বিষয়ে পুলিশ কেন নীরব?
প্রশাসনের এই প্রক্রিয়াকে অনেকেই “পক্ষপাতদুষ্ট ও আর্থিক প্রভাবিত” বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই মামলার নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করছেন সালমান জামানের আপন চাচা, আমেরিকা প্রবাসী এনামুল কবির মজনু। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রবাসী মজনু অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ভাতিজা নোমান আহমদকে বাদী হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
জানা গেছে, সালমান জামান যে বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন, সেটির মালিকানা দুই ভাই—কবির মিয়া ও এনামুল কবির মজনু। এনামুল কবির মজনু প্রবাসে থাকলেও কবির মিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটি ভোগদখল করে আসছেন। প্রায় ৬ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত তিন কক্ষবিশিষ্ট টিনশেড ঘরের একটি কক্ষে সালমান জামান পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ছয় মাস ধরে চাচা মজনু মিয়া তাকে জোরপূর্বক ঘর ছাড়তে চাপ দিয়ে আসছিলেন। তবে জায়গার আনুষ্ঠানিক বাটোয়ারা না হওয়ায় সালমান জামান তা প্রত্যাখ্যান করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে দেওয়ানী ও পারিবারিক বিরোধকে ফৌজদারি মামলায় রূপ দিয়ে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, একদিকে পারিবারিক দ্বন্দ্বকে পুঁজি করে একটি পক্ষ প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করছে, অন্যদিকে পুলিশ নৈতিক দায়িত্ব ভুলে গিয়ে অভিযোগ যাচাই না করেই মামলা রেকর্ড ও গ্রেফতার কার্যক্রম চালিয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আজ একজন সাংবাদিক, কাল সাধারণ মানুষ—এভাবে যদি পারিবারিক বিরোধে চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে মানুষ গ্রেফতার করা হয়, তবে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে না।”
এ ঘটনায় সাংবাদিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, মিথ্যা মামলার দায়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং পুলিশের ভূমিকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।