প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ জানুয়ারি ২০২৬
নগরীর লামাবাজার ফাঁড়ি এলাকায় বেপরোয়া জুয়ার বোর্ড, নীরব পুলিশ—বখরার রাজত্বে আইন বন্দী?
সিলেট এডিশন ডেস্ক
নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেট নগরীর উত্তর সুরমার কোতোয়ালী থানার একাধিক এলাকায় প্রকাশ্যে চলছে জুয়ার বোর্ড ও মাদক ব্যবসা। দিনের পর দিন এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও পুলিশের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ—জুয়ার সিন্ডিকেটের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশের অদৃশ্য সখ্যই এই অপরাধ সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রেখেছে।
ঘাসিটুলা, মোকাম বাজার, কানিশাইল, কেয়াঘাট,বাগবাড়ী, কুয়ারপাড়, রিকাবীবাজার—এই এলাকাগুলো এখন কার্যত শিলং তীর ও জান্ডিমুন্ডু জুয়ার ‘ওপেন জোনে’ পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এতসব জায়গায় প্রকাশ্যে জুয়া চললে পুলিশ কি আদৌ জানে না, নাকি জানার পরও না জানার ভান করছে?
ঘাসিটুলা মোকাম বাজার: জুয়ারী মুন্নার ‘অঘোষিত রাজ্য’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উত্তর সুরমার ঘাসিটুলা মোকাম বাজারে বড় মসজিদের সামনে সুরমা নদীর পাড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে জুয়ারী মুন্নার নেতৃত্বে বেপরোয়া জুয়ার আসর। প্রতিদিন এখানে শিলং তীর ও জান্ডিমুন্ডু নামের জুয়ার মাধ্যমে হাতবদল হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এই জুয়ার বোর্ড পুলিশ দেখেও দেখে না। কারণ উপরের লাইন ঠিক আছে।” তাঁদের ভাষায়, লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির একটি অংশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদেই মুন্না নির্বিঘ্নে এই প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি এসব অবৈধ জুয়া ও মাদকের আস্তানা থেকে ফাঁড়ির নামে সপ্তাহে ৮০ হাজার থেকে লক্ষ টাকা নিয়মিত বখরা আদায় করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ সংগ্রহের দায়িত্বে আছেন টু-আইসিির একজন সোর্স, স্থানীয়দের প্রশ্ন—যেখানে বখরা আসে নিয়মিত, সেখানে অভিযান আসবে কীভাবে?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তর সুরমা ও কোতোয়ালী থানাধীন লামাবাজার ফাঁড়ির আওতায় আরও একাধিক জুয়ার বোর্ড সক্রিয়—শামিমাবাদ খান সেন্টারের সামনে
জুয়ারী আলম, মনিকা সিনেমা হল সংলগ্ন কলোনির ভেতরে জুয়ারী আনু, বাগবাড়ী ব্রিজের পাশে জুয়ারী শিমুল, ঘাসিটুলা মরাটিলা মাদরাসা গলির মুখে
জুয়ারী রাসেল, কুয়ারপাড় (ভিতরের পয়েন্ট),টিকরপাড়া গলিতে জুয়ারী বাবর/শামীম, রিকাবীবাজার নূরী রেস্টুরেন্ট সংলগ্ন গলিত শিলং তীরের জমজমাট আসর, এছাড়াও জুয়ারী জহির কোয়ারপাড়(হাওর), জুয়ারী আসাদ-সালাম খুলিয়া পাড়া, জুয়ারী মিঠু কোয়ারপাড়, শিপলু মেডিকেল সেঞ্চুরি, জুয়ারী আলম কানিশাইল কেয়াঘাট, এছাড়া লামাবাজার মদনমোহন কলেজের উত্তরপাশের গলির ভিতর সরষপুর মাদক ব্যবসায়ী ডুঙ্গা সেলিম, একই এলাকায় আরেক মাদক ব্যবসায়ী শুকুর আলী। এতগুলো স্পটে জুয়া চললে তা কি প্রশাসনের অজানা থাকতে পারে?
শুধু জুয়াই নয়—এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঘাসিটুলা ও কানিশাইল এলাকায় জসিম নামের এক ব্যক্তি প্রকাশ্যে ইয়াবা ব্যবসা চালাচ্ছে। দাবি করা হয়, লামাবাজার ফাঁড়ির নামে প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে ‘ম্যানেজ’ দেওয়া হচ্ছে। ফলে মাদকের বিরুদ্ধেও নেই কার্যকর অভিযান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, “আমাদের এলাকা এখন অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যুব সমাজ ধ্বংস হচ্ছে, আর পুলিশ বখরার হিসাব মেলাচ্ছে।” তাঁরা অবিলম্বে—যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান, ডিবি পুলিশের স্বাধীন তদন্ত এবং এসএমপি কমিশনারের সরাসরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও নাগরিক সংগঠনগুলোকে রাস্তায় নামার আহ্বানও জানান তাঁরা।
বখরার বিষয়ে জানতে লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির টু আইসি এসআই জুয়েল'র মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন,“জুয়া ও মাদকের বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স। আমি মাত্র যোগ দিয়েছি। এসব কিছু জানিনা, তবে খোজঁ নিয়ে ব্যবস্থা নিবো, কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ করা সময়সাপেক্ষ। তিনি আরো বলেন কেউ আমার নাম ব্যবহার করে সুবিধা নিলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নির্দিষ্ট স্থান, নির্দিষ্ট নাম, নির্দিষ্ট অঙ্ক—সবকিছু প্রকাশ্যে উঠে আসার পরও যদি জুয়ার বোর্ড বন্ধ না হয়, তাহলে প্রশ্ন একটাই—আইন কি এখানে কার্যকর, নাকি বখরার টাকায় আইন নিজেই জিম্মি? এই প্রশ্নের জবাব এখন সিলেট মহানগর পুলিশের কাছেই প্রত্যাশা করছে নগরবাসী।
প্রকাশক ও সম্পাদক: কামরুল হাসান জুলহাস
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।