প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
জাফলং সীমান্তে বেপরোয়া সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র নেতৃত্বে মান্নান মেম্বার
সিলেট এডিশন ডেস্ক
গোয়াইনঘাট থেকে:: গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং সীমান্ত এলাকা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় অবৈধ পণ্য, মাদকদ্রব্য ও অস্ত্র বাংলাদেশে প্রবেশ করছে—এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে আলোচিত। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, সীমান্ত দিয়ে নিয়মিতভাবে ভারতীয় কম্বল, কসমেটিকস, খাদ্যপণ্য, মোটরসাইকেল, নিষিদ্ধ মাদক ও অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি।
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশ রেঞ্জ ডিআইজি একাধিকবার সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান বন্ধে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন সীমিত বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। নবাগত পুলিশ সুপার দায়িত্ব গ্রহণের পর চোরাচালান বন্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিলেও মাঠপর্যায়ে এর দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
সংঘবদ্ধ চোরাচালান সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, জাফলং সীমান্তে সংঘবদ্ধ একটি চোরাচালান চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা সাদ্দাম রুহির ছেলে আব্দুল মান্নান ওরফে মান্নান মেম্বার–এর নাম বারবার উঠে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি নিজেকে থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কথিত লাইনম্যান হিসেবে পরিচয় দিয়ে সীমান্ত এলাকার প্রায় ২০–২৫টি পয়েন্টে চোরাচালান কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। চোরাচালানকারীদের কাছ থেকে তিনি ‘লাইন’ দেওয়ার নামে নিয়মিত অর্থ আদায় করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো—জাফলং জিরোপয়েন্ট বিজিবি ক্যাম্পের অদূরেই নিয়মিতভাবে ভারতীয় চোরাই পণ্যের কেনাবেচা হয়। স্থানীয়রা জানান, এই স্থানটি বর্তমানে ‘ভারতীয় কম্বলের হাট’ হিসেবে পরিচিত। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এখান থেকে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের নাম ব্যবহার করে নিয়মিত বখরা আদায় করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত ২১ ডিসেম্বর স্থানীয় বিজিবি একটি অভিযান পরিচালনা করলেও অভিযানের আগেই চোরাচালানকারীরা মালামাল সরিয়ে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অভিযানটি কার্যত ফলপ্রসূ হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, অভিযানের তথ্য আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় চোরাচালানকারীরা সতর্ক হয়ে যায়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাতের অন্ধকারে সীমান্ত অতিক্রম করে কম্বল বহন করে একটি দোকানে প্রবেশ করা হচ্ছে। স্থানীয়রা দাবি করেছেন, দোকানটি মান্নান মেম্বারের ভাই লোকমানের পরিচালনাধীন। ভিডিওটি প্রকাশের পর সীমান্ত এলাকায় অবৈধ পণ্য প্রবেশের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্যমতে, পূর্ববর্তী সরকার আমলে মান্নান মেম্বার ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে পুনরায় একই কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, চোরাচালান সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ বন্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর চাপ প্রয়োগ, হুমকি প্রদান এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। এমনকি সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত থাকলে পত্রিকা অফিসে হামলার হুমকির কথাও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
তামাবিল, নলজুরি, বল্লাঘাট, লালমাটি, সোনাটিলা ও আশপাশের সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ পণ্য প্রবেশের ধারাবাহিক অভিযোগ সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
একাধিক গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—এই সংঘবদ্ধ চোরাচালান কার্যক্রম কি প্রশাসনিক উদাসীনতার সুযোগেই টিকে আছে? সীমান্ত নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা ও জনস্বার্থ রক্ষায় বিষয়টি দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
প্রকাশক ও সম্পাদক: কামরুল হাসান জুলহাস
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।