প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬
সিলেটে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সিরিয়াল জটিলতায় রোগীদের নাভিশ্বাস
সিলেট এডিশন ডেস্ক
শাহান আহমেদ চৌধুরী :: সিলেটে নামিদামি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দেখাতে গিয়ে সিরিয়াল পেতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। চিকিৎসকদের ভিজিটিং কার্ডে সিরিয়াল নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট ফোন নম্বর ও সময় উল্লেখ থাকলেও ওই সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন করেও অনেক রোগী অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
রোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে সিরিয়ালের জন্য ফোন করলে অনেক সময় নম্বর ব্যস্ত পাওয়া যায়। আবার কখনো বারবার ফোন করেও সংযোগ পাওয়া যায় না। দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করে যোগাযোগ সম্ভব হলেও ততক্ষণে সিরিয়াল শেষ হয়ে যায়। ফলে অসুস্থ অনেক রোগীকেই চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন দূর-দূরান্ত থেকে সিলেটে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা।
এক ভুক্তভোগী রোগী বলেন, “ভিজিটিং কার্ডে দেওয়া নম্বরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একের পর এক ফোন করেছি। অনেকবার চেষ্টা করেও সিরিয়াল পাইনি। অসুস্থ অবস্থায় একজন রোগীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন করে সিরিয়াল নিতে হলে বিষয়টি খুবই কষ্টের।”
জগন্নাথপুর থেকে সিলেটে মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. শিশির চক্রবর্তীর কাছে চিকিৎসা নিতে আসেন রোগী খাইরুল ইসলাম। তিনি জানান, সিরিয়ালের জন্য দীর্ঘ সময় ফোনে চেষ্টা করেও সফল হননি। পরে সরাসরি চেম্বারে এসে চিকিৎসকের সাক্ষাৎ পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত রাত ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও চিকিৎসকের দেখা না পেয়ে ফিরে যেতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে ডা. শিশির চক্রবর্তীর অ্যাটেনডেন্ট রমজান বলেন, “সিরিয়াল আমরা দিই না। স্যারের নিজস্ব লোকের মাধ্যমে সিরিয়াল দেওয়া হয়।” এ ঘটনায় রোগীদের প্রশ্ন—চিকিৎসকের নির্ধারিত নম্বরে ফোন করেও যদি সিরিয়াল না মেলে, আবার চেম্বারে গিয়েও যদি চিকিৎসকের সাক্ষাৎ পাওয়া না যায়, তাহলে সাধারণ রোগীরা চিকিৎসাসেবা পাবেন কীভাবে?
সিলেটের মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে মেডিসিন ও গ্যাস্ট্রোলিভার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. আলমগীর সাফাওয়াতের সিরিয়াল নিতে গিয়েও একই ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ করেছেন রোগী খালিছুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, “নির্ধারিত সময়ে চারটি ফোন নম্বর থেকে বারবার কল করেছি। শতবারেরও বেশি চেষ্টা করেও সিরিয়াল পাইনি। অসুস্থ অবস্থায় এভাবে ফোন করতে করতে একজন রোগী আরও অসহায় হয়ে পড়েন।”
অন্যদিকে কানাইঘাট থেকে দীর্ঘদিনের কোমরের ব্যথা নিয়ে অধ্যাপক ডা. ইশতিয়াক উল ফাত্তাহর কাছে চিকিৎসা নিতে সিলেটে আসেন রোগী আক্তারুজ্জামান। কিন্তু সিরিয়াল না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের সাক্ষাৎ না পেয়েই ফিরে যেতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
শুধু সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা নয়, কিছু চিকিৎসকের চেম্বারে রোগী দেখার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রোগীরা। তাদের অভিযোগ, কোনো কোনো চেম্বারে একই সময়ে একাধিক রোগীকে চিকিৎসকের কক্ষে বসিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এতে রোগীরা তাদের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল শারীরিক সমস্যার কথা চিকিৎসকের কাছে স্বাচ্ছন্দ্যে বলতে পারেন না।
যৌন, চর্ম ও অ্যালার্জি-সংক্রান্ত সমস্যার চিকিৎসা নিতে জগন্নাথপুর থেকে সিলেটে আসা জিয়াউল হক অভিযোগ করে বলেন,ডাক্তার ইকবাল স্যার কে দেখাতে আসি “চেম্বারে একাধিক রোগীকে একসঙ্গে বসিয়ে রাখেন তিনি স্কিনের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে অনেক ব্যক্তিগত বিষয় বলতে হয়। কিন্তু পাশে অন্য রোগী থাকলে ব্যক্তিগত বিষয়গুলো খোলামেলা বলা সম্ভব হয় না।”
এক নারী রোগী বলেন, “চিকিৎসকের কাছে অনেক ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলতে হয়। কিন্তু একই সময়ে কক্ষে অন্য রোগী থাকলে সবকিছু খোলামেলা বলা সম্ভব হয় না। অস্বস্তির কারণে অনেক কথাই বলা হয়ে ওঠে না।” আরেক রোগীর ভাষ্য, “চিকিৎসকের কাছে নিজের সমস্যাগুলো নির্ভয়ে বলা চিকিৎসারই একটি অংশ। কিন্তু পাশে অন্য রোগী থাকলে অনেক বিষয় গোপন রাখতে হয়। এতে চিকিৎসকও রোগীর পুরো সমস্যাটি জানতে পারেন না।”
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ডা. মো. মাহবুবুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় শংকর দত্ত বলেন, “প্রাইভেট চেম্বারের চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত বিষয় আমরা নিয়ন্ত্রণ করি না। তবে কেউ সরাসরি অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেব।” রোগীর গোপনীয়তার বিষয়ে তিনি বলেন, “রোগীদের ব্যক্তিগত বিষয় একজন চিকিৎসকের কাছেই বলা সম্ভব। সেখানে যদি একসঙ্গে একাধিক রোগী বসিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়, তাহলে রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা থাকে না। এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেব।”
ভুক্তভোগী রোগীদের দাবি, চিকিৎসকদের সিরিয়াল দেওয়ার পদ্ধতি আরও সহজ, স্বচ্ছ ও রোগীবান্ধব করা জরুরি। নির্ধারিত সময়ে ফোনের পাশাপাশি অনলাইন বা ডিজিটাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা হলে রোগীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকের চেম্বারে রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে একসঙ্গে একাধিক রোগী না বসিয়ে প্রত্যেক রোগীকে আলাদাভাবে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রোগীদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, হাসপাতাল ও চেম্বার কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন। চিকিৎসা নিতে এসে সিরিয়ালের জন্য হয়রানি নয়—সহজ, স্বচ্ছ, গোপনীয় ও সম্মানজনক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই এখন রোগীদের প্রধান দাবি।
প্রকাশক ও সম্পাদক: কামরুল হাসান জুলহাস
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।