প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৫
হযরত শাহজালাল (রহ.) এর রাজকীয় ফরমান আলোচনা ও পর্যালোচনা
সিলেট এডিশন ডেস্ক
এ.এফ.এম. শহীদুল ইসলাম সেলিম::
বিখ্যাত পরিব্রাজক, ঐতিহাসিক মুহাম্মদ ইবনে বতুতা (রহ.) এর রিহলা, হযরত ফরিদ উদ্দিন গঞ্জেশকর (রহ.) এর ইসরারুল আউলিয়া, হযরত আমির খসরু (রহ.) লিখিত নিযামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) এর মালফুজাত ফাওয়েদুল ফুয়াদসহ বিভিন্ন সময়ে হযরত শাহজালাল (রহ.) সংশ্লিষ্ট রাজকীয় ফরমান/শিলালিপি বিশ্লেষণে তাঁকে তাবরিজী ও কুনিয়াভী উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত শাহজালাল (রহ.) ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে ওফাতের ৫১৫ বছর পরে ১৮৬০ ইং সালে সিলেটের তৎকালীন মুন্সেফ নাসিরুদ্দিন হায়দার সোহেলে ইয়েমেনী নামক গ্রন্থে হযরত শাহজালাল (রহ.)-কে ইয়েমেনী বলে উল্লেখ করেছেন। উক্ত সোহেলে ইয়েমেনীর বাংলা অনুবাদ তারিখে জালালি গ্রন্থের ১ম অধ্যায়ে লিখক রওজাতুস সালেহীন নামক একটি বইয়ের রেফারেন্স উল্লেখ করলেও এর কোন উদ্ধৃতি কোট করেননি। তাছাড়া উক্ত রেফারেন্স বইয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.) কেন্দ্রিক কিছু ঘটনার উল্লেখ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না মর্মে উর্দু অনুবাদক মাওলানা মবশ্বির আলী চৌধুরী উল্লেখ করেছেন। সুতরাং হযরত শাহজালাল (রহ.) এর সমকালীন কিতাবাদী, পরবর্তীতে রাজকীয় ফরমান ও শিলালিপিতে উল্লেখিত কুনিয়াভী ও তাবরিজী এর বিপরীতে ভিত্তিহীন গল্প রচনা করে ইয়েমেনে তার জন্মস্থান উল্লেখ করা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মূলতঃ হযরত শাহজালাল (রহ.)এর জন্মস্থান তৎকালীন খোয়ারিজমের উরগঞ্জের (বর্তমান উজবেকিস্তানের খিবা) নিকটবর্তী কুনিয়া নামক স্থানে। উক্ত কুনিয়াতে বর্তমানেও তাঁর পিতামহ সুলতান তাকিশের মাজার বিদ্যমান রয়েছে। আর তিনি তার শাসনামলের ২য় দফায় রাজধানী তাবরীজে স্থানান্তর করে সেখানে বসবাস করায় তার নামের শেষে পরিচিতি হিসেবে তাবরিজী ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। তাছাড়া ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীর আরব-আজমের উল্লেখযোগ্য মুসলিম ইতিহাসবেত্তা মিনহাজ ই সিরাজ জুরজানি (রহ.), মুহাম্মদ ইবনে বতুতা (রহ.) ইবনে খাল্লিকান (রহ.), আল্লামা হফেজ ইবনে কাসির (রহ.) ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) সহ কোন ঐতিহাসিকই ইয়েমেনে জালালুদ্দিন বা শাহজালাল নামে কোন পীর-দরবেশ বা বুজুর্গের কথা উল্লেখ করেননি। এছাড়াও ইয়েমেনসহ আরব অঞ্চলে শাহ জালাল বা জালালুদ্দিন নামের প্রচলন দেখা যায় না। কোন কোন লেখক আবু সাঈদ তাবরিজী (রহ.) কে তাঁর পীর বিবচনায় তার নামের শেষে তাবরিজী ব্যবহার হয়েছে মর্মে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাবরিজ কোন সিলসিলার বা ত্বরিকার নাম নয়, এটা একটা স্থান বিশেষ। সাধারণতঃ কোন মুর্শিদের খলিফা বা শিষ্যগণ কাদেরি, চিশতি, নক্সবন্দী, মোজাদ্দেদি ইত্যাদি তরিকা বা সিলসিলার উপাধি সংযুক্ত করে থাকেন। সেক্ষেত্রে কেউ মুজাদ্দেদি সিলসিলাভুক্ত হলে তার নামের শেষে মুজাদ্দেদি লিখবেন, কিন্তু সেরহিন্দি লিখলে বুঝতে হবে তিনি সেরহিন্দের বাসিন্দা। তাবরিজ যেহেতু কোন ত্বরিকার নাম নয় বরং স্থানের নাম, তাই তাবরিজী বলতে সেখানকার অধিবাসী বুঝাবে। অতএব, হযরত শাহজালাল (রহ.) ইয়েমেনের বংশদ্ভূত মর্মে বর্ণিত অলীক কাহিনি ইংরেজ আমলের সৃষ্ট এবং মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও জঠিলতা তৈরীর উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ ও তার দোসরদের তাবলিগী-দেওবন্দী-বেরলভী, সুন্নী-ওহাবী-সালাফি ইত্যাদি ফিরকা তৈরীর মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ন্যায় একটি নীলনকশা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। অন্য দিকে হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মামা হিসেবে হযরত আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দী (রহ.) ও মাতামহ (নানা) হিসেবে হজরত জালাল সুরুখ বুখারী (রহ.) পরিচয়ে কল্পিত গল্প প্রচার করা হয়েছে। মুহাম্মদ ইবনে বতুতা (রহ.) সহ পূর্বোক্ত সূত্রের বর্ণনায় হযরত শাহজালাল (রহ.) এর জন্ম সাল ১১৯৫/৯৬ খ্রিস্টাব্দ মর্মে বিখ্যাত ঐতিহাসিক ড.আঃ করিম, ঐতিহাসিক মো. কলিম উল্লাহ, হযরত শাহজালাল (রহ.) এর উপর বরেণ্য গবেষক দেওয়ান নুরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, হযরত শাহজালাল (রহ.) এর উপর পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনকারী ড. তুতিউর রহমানসহ উল্লেখযোগ্য সকল ঐতিহাসিক/গবেষক একমত পোষণ করেছেন। সেক্ষেত্রে তার মাতামহ হিসেবে উল্লেখিত হযরত জালাল সুরুখ বুখারী (রহ.) জন্মসাল একাধিক সূত্রে ১১৯৫ খ্রি./১১৯৯ খ্রি. উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ হযরত শাহজালাল (রহ.)এবং জালাল সুরুখ বুখারী (রহ.) উভয়ের জন্ম বারোশ শতাব্দীর সর্বশেষ দশকে। আর তাঁর মামা সাঁজিয়ে যাকে নিয়ে এত গল্প রচনা করা হয়েছে, সেই আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দী (রহ.) এর জন্ম হয়েছে ইংরেজি ১২৬০/১২৭০ এর দশকে অর্থাৎ তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) থেকে ন্যূনতম ৬০/৭০ বছরের ছোট। হযরত আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দী (রহ.) এর ছেলে হযরত জাহানিয়া জাহানগাস্ত (রহ.) এর জন্ম তারিখ ১৯ জানুয়ারি ১৩০৮ খ্রি.সহ বিস্তারিত বর্ণনা গুজরাট বিশবিদ্যালয় থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২১ সালে প্রকাশিত রিসার্চ পেপার Expression of two schools of sufism in one Suhrawardi Bukhari lineage -এ উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া,বুখারা বা পাকিস্তানের উচ-এ বসবাসকারী বাবা বা ভাই মধ্যযুগের গোঁড়া সমাজ ব্যবস্থার কোন সূত্রে দুই হাজার মাইল দূরে ইয়েমেনে মেয়ে বিয়ে দিতে পারে, সেলুকাস! তাবাকাতে নাসিরি ১ম খন্ড ও সিরাতে সুলতান জালালুদ্দিন সূত্রে জানা যায়, মূলতঃ হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মামার বাড়ি হচ্ছে আফগানিস্তানের হেরাত। তাঁর মামা সৈয়দ ওয়াজিহ উদ্দিন হোসাইনী খারমিল ছিলেন ঘুরি সাম্রাজ্যের উজির এবং তিনি উপমহাদেশে সুলতান শিহাবুদ্দিন শাম ঘুরিকে পৃথ্বীরাজ চৌহানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করেন এবং তারাইনের যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ চৌহানের বাহিনীর বিরুদ্ধে মুহাম্মদ শাম ঘুরির সাথে একজন সেনাপতি হিসেবে অংশগ্রহন করেন। তাঁর অসীম বীরত্ব ও সঠিক যুদ্ধ পরিকল্পনার কারণে মুসলমানরা যুদ্ধে বিজয় লাভকরেছিল মর্মে ঐতিহাসিকগণ মত প্রকাশ করেছেন। সূত্র: ০১ হযরত শাহজালাল (র.) দলিল ও ভাষ্য দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী। ০২। রিহলায়ে ইবনে বতুতা- আগা মাহদি হোসাইন পৃ: ৪৫৯ ০৩। হজরত শাহজালাল ও তাঁর সফর সঙ্গী সিলেটের ধর্ম জীবন ওসমাজবীক্ষণ- ড. তুতিউর রহমান পৃ: ১৮৯-১৯১। ০৪। তাবাকাতে নাসিরি-মিনহাজ ই সিরাজ ১ম খন্ড- পৃ:২৬৮- ৭০০৫। উইকিপিডিয়া: সৈয়দ জালাল সুরুখ বুখারী। [ লেখক সুফি গবেষক ]
প্রকাশক ও সম্পাদক: কামরুল হাসান জুলহাস
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।