প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬
সিলেট এডিশন ডেস্ক
আসাদ ঠাকুর: হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার ৫নং শানখলা ইউনিয়নের মহিমাউড়া গ্রামের কৃতি সন্তান আলহাজ্ব মোঃ আব্দুল আহাদ সর্দার—একজন সফল ব্যবসায়ী, সমাজসেবক, দানবীর, শিক্ষানুরাগী, সংগঠক ও মানবিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সততা, পরিশ্রম, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি নিজেকে সমাজের একজন গ্রহণযোগ্য ও শ্রদ্ধাভাজন মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি কেবল একজন ব্যবসায়ী নন; বরং একজন মানবিক অভিভাবক, সমাজ নির্মাতা এবং অসংখ্য মানুষের আস্থার প্রতীক।
১৯৭৩ সালে চুনারুঘাট উপজেলার শানখলা ইউনিয়নের মহিমাউড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আলহাজ্ব মোঃ আব্দুল আহাদ সর্দার। তাঁর পিতা মোঃ রহিম উল্লাহ সর্দার। ছোটবেলা থেকেই তিনি ধর্মীয় ও মূল্যবোধসম্পন্ন পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। সততা, পরিশ্রম ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা তাঁর জীবনগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জীবনের শুরুটা ছিল সংগ্রামময়। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমকে পুঁজি করে তিনি এগিয়ে চলেন। প্রতিকূলতাকে কখনো বাধা নয়, বরং শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সেই সংগ্রামী পথচলাই তাঁকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
আব্দুল আহাদ সর্দারের ব্যবসায়িক জীবনের সূচনা ১৯৯০ সালে। চুনারুঘাট উপজেলার ডেওয়াতুলি আউলিয়া বাজারে একটি ছোট টং দোকানের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর ব্যবসার পথচলা। অল্প পুঁজি, সীমাবদ্ধতা এবং নানা প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি হার মানেননি। সততা, নিষ্ঠা এবং গ্রাহকদের প্রতি আন্তরিক আচরণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা অর্জন করেন।
প্রায় ১৪ বছরের নিরলস পরিশ্রম ও ত্যাগের পর ২০০৪ সালে হবিগঞ্জ শহরের ফায়ার সার্ভিস রোডে প্রতিষ্ঠা করেন “আহাদ থাই অ্যালুমিনিয়াম”। বর্তমানে এটি জেলার অন্যতম পরিচিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
আলহাজ্ব মোঃ আব্দুল আহাদ সর্দার বিশ্বাস করেন, ব্যবসার উদ্দেশ্য শুধু ব্যক্তিগত লাভ নয়; সমাজের কল্যাণে অবদান রাখাও একজন ব্যবসায়ীর দায়িত্ব। তাঁর ভাষায়, “মানুষের জন্য ব্যয় করা সম্পদই প্রকৃত সম্পদ। মানুষের দোয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে বড় কোনো অর্জন নেই।”
এই বিশ্বাস থেকেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের ব্যবসার প্রায় ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ মানবিক ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে আসছেন। তাঁর দান-অনুদানের লক্ষ্য ব্যক্তিগত প্রচার নয়; বরং মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানুষের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত রাখা।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মসজিদ ও মাদ্রাসা উন্নয়নে তাঁর অবদান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। শানখলা ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় তিনি মসজিদ নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নকাজে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। মহিমাউড়া শাহ আব্দাল জামে মসজিদ, মহিমাউড়া হাজীবাড়ী জামে মসজিদ, মহিমাউড়া উত্তর জামে মসজিদ, মির্জাপুর গাউছিয়া জামে মসজিদ, পশ্চিম মহিমাউড়া জামে মসজিদ, রঘুরন্দন জামে মসজিদ, পাট্টাশরীফ জামে মসজিদ, সুলতানপুর জামে মসজিদ ও ডিগিরপাড় জামে মসজিদে তিনি টাইলস, স্পিকার, থাই গ্লাস, সিমেন্ট ও নগদ অর্থসহ নানা ধরনের সহায়তা প্রদান করেছেন।
একইভাবে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে তিনি বিভিন্ন মাদ্রাসায় উল্লেখযোগ্য অনুদান দিয়েছেন। সাদেকপুর তৈয়ব আলী হাফিজিয়া মাদ্রাসা, ভাদৈ জামিয়া মাআরিফুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসা, পঞ্চাশ হযরত হারুন গাজী সুন্নিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, ভাদৈ দারুল ইরশাদ হাফিজিয়া মাদ্রাসা, মহিমাউড়া বাচ্চু মিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, ডেওয়াতুলি হাফিজিয়া মাদ্রাসা এবং বাগলাকুট দরবার শরীফে তিনি অর্থ, সিমেন্ট, ইট, আইপিএস, থাই গ্লাসসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়েছেন।
শিক্ষা ছাড়া জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়—এই বিশ্বাস থেকেই তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ডেওয়াতুলি আইডিয়াল স্কুল, শানখলা মডেল একাডেমি এবং লালচান্দ বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে তিনি আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের পোশাক, শিক্ষা উপকরণ ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও রয়েছে তাঁর অবদান।
তরুণ সমাজকে গঠনমূলক ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সহায়তা করেছেন। ডেওয়াতুলি যুবশক্তি সামাজিক সংগঠন, মহিমাউড়া যুবশক্তি সামাজিক সংগঠন এবং মহিমাউড়া স্বপ্নধারা স্পোর্টিং ক্লাবের উন্নয়ন ও কার্যক্রমে তিনি উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। সংগঠনের ঘর নির্মাণ, বুকশেলফ তৈরিসহ নানা প্রয়োজনেও তিনি এগিয়ে এসেছেন।
আলহাজ্ব মোঃ আব্দুল আহাদ সর্দার মানবসেবাকে নিজের নৈতিক দায়িত্ব মনে করেন। অসহায় পরিবারের মেয়ের বিয়েতে সহায়তা, দরিদ্র পরিবারের জন্য বসতঘর নির্মাণ, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো, ক্যান্সার রোগী ও গরিব মানুষের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা—এসব কাজের মাধ্যমে তিনি মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তিনি ৫টি অসহায় পরিবারের মেয়ের বিয়েতে ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা দিয়েছেন। কয়েকটি দরিদ্র পরিবারের জন্য প্রায় ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বসতঘর নির্মাণ করেছেন। এছাড়া শানখলা ইউনিয়নের পানছড়ি আশ্রয়ণে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা করেছেন। অসংখ্য অসহায় ও রোগাক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বহন করে তিনি মানুষের পাশে থেকেছেন নীরবে, নিঃস্বার্থভাবে।
নিজের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দুটি ঘটনার কথা বলতে গিয়ে আব্দুল আহাদ সর্দার বলেন, অনেক ভালো কাজ করলেও দুটি ঘটনা তাঁকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। প্রথমটি কক্সবাজারের চকরিয়ার এক ক্যান্সার আক্রান্ত মেয়ের চিকিৎসায় সহযোগিতা, যার ফলে দীর্ঘ চিকিৎসার পর মেয়েটি সুস্থ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়টি চুনারুঘাটের গাজীপুর এলাকার এক লিভার আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা সহায়তা, যে ভারতে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসে।
তাঁর ভাষায়, “এই দুই শিশুর সুস্থ হওয়ার সংবাদ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের মুহূর্তগুলোর একটি।”
ধর্মীয় কার্যক্রমেও তাঁর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। ২০১০ সাল থেকে প্রতি রমজানে জেলার বিভিন্ন হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানায় নিয়মিত ইফতার বিতরণ করে আসছেন তিনি। এ খাতে প্রতি বছর তাঁর ব্যয় প্রায় ২ লাখ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে গড়ে ১ লাখ টাকার বেশি হাদিয়া প্রদান করেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়ন এবং ইসলামি শিক্ষার প্রসারেও তাঁর সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
শুধু ব্যবসা ও দান-অনুদানেই নয়, বিভিন্ন সামাজিক, ব্যবসায়িক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃত্বেও সক্রিয় রয়েছেন আলহাজ্ব মোঃ আব্দুল আহাদ সর্দার। বর্তমানে তিনি হবিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস রোড ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি, হবিগঞ্জ জেলা টাইলস অ্যান্ড সিরামিক শ্রমিক সমিতির সভাপতি, মধুমতি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পার্টনার, পঞ্চাশ হযরত হারুন গাজী সুন্নিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার সভাপতি, চুনারুঘাট যুব ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা, মহিমাউড়া সম্প্রীতির বন্ধন সামাজিক সংগঠনের উপদেষ্টা, মাসুক মিয়া মডেল হাফিজিয়া মাদ্রাসার উপদেষ্টা এবং পঞ্চাশ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সাবেক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ব্যবসায়িক ও ধর্মীয় কারণে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, চীন, জাপান, তুরস্ক, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১৪টিরও বেশি দেশে মোট ৩৬ বার সফর করেছেন। তিনি একবার হজ এবং তিনবার ওমরাহ পালন করেছেন। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার পাশাপাশি ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান উন্নয়নে তাঁর অবদান অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় জনগণের মতে, আলহাজ্ব মোঃ আব্দুল আহাদ সর্দার একজন প্রচারবিমুখ দানবীর। মানুষের দুঃসময়ে তিনি সবার আগে এগিয়ে আসেন। তাঁর দানশীলতা, সততা, মানবিকতা এবং সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড তাঁকে মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, “তিনি শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী নন, তিনি শানখলা ইউনিয়নের গর্ব; সমাজের একজন কীর্তিমান সূর্যসন্তান। তাঁর কর্মময় জীবন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানবসেবা, সততা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেবে।”
ব্যবসায়িক সাফল্যকে মানবসেবার সঙ্গে একসূত্রে গেঁথে যে মানুষটি সমাজে নিজস্ব এক উজ্জ্বল অবস্থান তৈরি করেছেন, তিনি আলহাজ্ব মোঃ আব্দুল আহাদ সর্দার। নিজের শ্রম, সততা, ঈমানি চেতনা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে পুঁজি করে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন সফল উদ্যোক্তা, মানবিক সমাজসেবক ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। মানুষের কল্যাণে নিবেদিত তাঁর এই পথচলা নিঃসন্দেহে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।