উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার চেলা নদীর সোনাপুর ও পূর্ব সোনাপুর এলাকায় নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালী কয়েকটি চক্রের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলায় নিরপরাধ ব্যক্তি, শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিদের আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, প্রশাসনের অভিযান ও মামলা হলেও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত কথিত মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীদের একটি চক্রের কারণে নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন ও বিভিন্ন স্থানে মজুতের কার্যক্রম চলছে। মাঝেমধ্যে প্রশাসনের অভিযান পরিচালিত হলেও মাঠপর্যায়ের শ্রমিকদের আটক বা ছোট নৌকা জব্দের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকছে। অন্যদিকে, বালু উত্তোলনের অর্থায়ন, নিয়ন্ত্রণ ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাঁদের।
গত ৬ সেপ্টেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চেলা নদীর সোনাপুর-পূর্ব সোনাপুর (মরা চেলা) এলাকায় অনুমোদন ছাড়া বালু উত্তোলনের অভিযোগে দোয়ারাবাজার থানায় একটি মামলা করা হয়। মামলায় ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। মামলাটি করেন পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের সহকারী পরিচালক মো. মুহাইমিনুল হক।
পরিবেশ অধিদপ্তরের দাবি, সরেজমিন পরিদর্শনে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়ার পর এ মামলা করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, মামলার আসামিদের মধ্যে অনেকে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নন। বরং অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী ও সাধারণ বাসিন্দাদেরও আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
মামলার আসামি সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ জানান, তিনি একটি মাদ্রাসার নিয়মিত শিক্ষক। পাশাপাশি ইছামতী বাজারে তাঁর একটি ফার্মেসি রয়েছে। শিক্ষকতার বাইরে অবসর সময়ে তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে ফার্মেসির ব্যবসায় সময় দেন। নদী থেকে বালু উত্তোলনের সঙ্গে তাঁর বা তাঁর পরিবারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তিনি। তারপরও তাঁকে মামলার আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আবুল কালাম আজাদ।
জহুর মিয়া নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে অনেকেই নিরপরাধ। শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসানো হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধ করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সোনাপুর ও পূর্ব সোনাপুর এলাকায় কয়েকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বালু উত্তোলন ও সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পদধারী ব্যক্তি ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা বালু উত্তোলন ও সরবরাহের সঙ্গে একাধিক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, নদী থেকে উত্তোলিত বালু কয়েক কিলোমিটার দূরের বিভিন্ন ডাম্পিং পয়েন্টে মজুত করা হচ্ছে। সেখানে বিপুল পরিমাণ বালু স্তূপ করে রাখা হলেও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে না। তাঁদের প্রশ্ন, নদী থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগে মামলা হলেও মজুত ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না।
অভিযানের খবর ফাঁসের অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের অভিযানের খবর আগেই সংশ্লিষ্ট বালু ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে অভিযান শুরুর আগেই প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সরে পড়েন এবং মাঠপর্যায়ে থাকা শ্রমিকেরা আটক হন। এতে সাময়িকভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও কিছুদিন পর আবারও কার্যক্রম শুরু হয় বলে অভিযোগ তাঁদের।
এলাকাবাসীর মতে, শুধু শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে জড়িত অর্থদাতা, নিয়ন্ত্রণকারী ও বালু বিপণনকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বালুর ডাম্পিং পয়েন্টগুলোতে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত করা বালু জব্দের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের সহকারী পরিচালক মোহাইমিনুল হক জানান, স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিন পরিদর্শন করেই মামলা দায়ের করা হয়েছে। এজাহারের বাইরে থাকা বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, চেলা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, মামলায় নিরপরাধ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ যাচাই এবং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।