প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
আধ্যাত্মিক সিলসিলা ও তরিকত বিষয়ে ঐতিহাসিক বিবরণ
সিলেট এডিশন ডেস্ক
সুলতানুল আউলিয়া হযরত শাহ্ জালাল রহ. এর আধ্যাত্মিক সিলসিলা/ত্বরীকা নিয়ে গবেষকদের ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে। মহান এ অলি আল্লাহর উপর ১ম একক বর্ণনা গুলজারে আবরারে (১৫৯১/১৬১৩ ইং) তাকে খাজা আহমদ ইয়াসাবি রহ. এর তরিকার একজন খলিফা বলা হয়েছে। সেই সূত্রে তিনি ইয়াসাবি ত্বরীকা/ সিলসিলার একজন শায়খ। আবার খাজা আহমদ ইয়াসাবি রহ. ১১৭৭খ্রি. সালে ওফাত লাভ করায় এই সিলসিলায় হযরত শাহজালাল রহ. এর মুর্শিদ কে ছিলেন বিষয়টি পরিষ্কার হয়নি।
গাউসি রচিত গুলজারে আবরার কিতাবে পারস্য ও উপমহাদেশের বহু অলি আল্লাহর জীবনীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা লিখার কারণে বর্ণনাগুলো আংশিক কাটছাঁট করা হয়েছে মর্মে এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে (১৯২৭ ইং) স্কলার এস.এম. ইকরাম উল্লেখ করেছেন। ফলে হযরত শাহজালাল রহ. এর বর্ণনার ক্ষেত্রেও কাটছাঁট করায় কিছু কিছু বর্ণনা বাদ পরেছে। তবে এ ক্ষেত্রে আমরা হযরত শেখ ফরিদ রহ. এর মলফুজাত ইসরারুল আউলিয়া, হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহ. এর মলফুজাত ফাওয়ায়েদুল ফুয়াদ, আবুল ফজল আল্লামীর আইনে আকবরী এবং হযরত আব্দুল হক মোহাদ্দেসে দেহলভী রহ. এর আখবারুল আখইয়ার এর সাহায্য নিয়ে বিষয়টির পরিষ্কার সমাধানে পৌঁছাতে পারি।
এই সবগুলো কিতাবেই শায়খ জালালুদ্দিন তবরেজী অর্থাৎ হযরত শাহজালাল রহ. এর ১ম পীর/মুর্শিদ সাঈদ তবরেজী/আবু সাঈদ তবরেজী মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনে আকবরী গ্রন্থে উক্ত সাঈদ তবরেজী/ সাঈদ তবরেজী(সাঈদ বাবা)কে খাজা আহমদ ইয়াসাবি রহ. এর প্রধান ০৪ জন খলিফার মধ্যে ২য় খলিফা উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং, এই উল্লেখযোগ্য প্রামাণ্য ইতিহাস গ্রন্থ/মলফুজাত নিরীক্ষণে আমরা হযরত শাহজালাল রহ. এর ১ম পীর/ মুর্শিদ সাঈদ তবরেজী রহ. যিনি খাজা আহমদ ইয়াসাবি রহ. খলিফা ছিলেন, তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি। উইকিপিডিয়ার সাহায্যে দেখা যায়, খাজা আহমদ ইয়াসাবি রহ. মাজার শরীফ কাজাকিস্তানের তুর্কিস্তান শহরে বিদ্যমান রয়েছে এবং খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যে তার সিলসিলা বিস্তারকারী খলিফা হযরত সাঈদ তবরেজী (সাঈদ আতা/সাঈদ বাবা) এর নামে উজবেকিস্তানর খিবায় মসজিদ রয়েছে।
বর্বর মোঙ্গলদের সাথে সর্বশেষ যুদ্ধের পর হযরত শাহজালাল রহ. রাজ্য শাসন ছেড়ে দরবেশি জীবনে পদার্পণ করে বাগদাদ চলে যান এবং জগৎ শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ অলি আল্লাহ ইমাম সিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দী রহ. এবং তার ওফাতের পর হযরত বাহাউদ্দিন সোহরাওয়ার্দী রহ. এর শিষ্যত্ববরন করে সোহরাওয়ার্দী ত্বরিকার খিলাফত ও ইজাজত লাভ করেন। ইবনে বতুতার রিহলার বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন, তার সিলেট অঞ্চলে আগমনের (১৩৪৫ ইং ) মূল উদ্দেশ্য ছিল তবরিযের মহান শায়খ জালালুদ্দিন (Sheikh Jalaluddin of Tabriz) এর সাথে সাক্ষাৎ করা। আবার সিলেটের হোসেনশাহী আমলের ৯১১ হি./১৫০৫ ইং সালের শিলালিপিতে হযরত শাহজালাল রহ. এর পরিচয় লেখা রয়েছে শায়খ জালাল মুজাররদ কুনিয়ায়ী (Sheikh Jalal the hermit of kaniya) । উইকিপিডিয়া ফ্যাক্ট চেকিং এ সুলতান জালালুদ্দিন মোহাম্মদ খাওয়ারিজম শাহ এর জন্মস্থান তুর্কেমেনিস্তানের কুনিয়ায় মর্মে উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমানেও উক্ত কুনিয়ায় হযরত শাহজালাল রহ . ( সুলতান জালালুদ্দিন খাওয়ারিজম শাহ) এর পিতামহ সুলতান তকিশ এবং প্রপিতামহ সুলতান ইল আরসালানের সমাধি রয়েছে। হযরত শাহজালাল রহ. বর্তমান তুর্কেমেনিস্তানের কুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করলেও তার শাসনামলে খাওয়ারিজমের রাজধানী ছিল তবরিজ এবং তিনি দীর্ঘদিন সেখানে বসবাস করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। ফলে জন্মসূত্রে তিনি কুনিয়ায়ী হলেও দীর্ঘ বসতি সূত্রে তিনি ছিলেন তবরেজী। ফলে মোঙ্গলদের কাছ থেকে আত্মগোপনের পর সুলতান জালালুদ্দিন খাওয়ারিজম শাহ দরবেশ শায়খ জালালুদ্দিন তবরেজী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং বাংলায়/সিলেট বিজয়ের পর পৃথিবীর ইতিহাসে ১ম পীর/ দরবেশ হিসেবে নিজ বুনিয়াদি পদবী শাহ্ যুক্ত করে সংক্ষেপে শাহ জালাল নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
আমরা আল্লাহ পাকের দরবারে এ মহান অলি আল্লাহ শাহেনশাহ হযরত শাহজালাল রহ. এর উচ্চ দারাজাত কামনা করছি এবং তার ফুয়ুজাত/বারাকাত লাভে ধন্য হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করছি। ওয়া আখিরুদ্দাওয়ানা আনিলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আ'লামিন।
সূত্র: ০১. রিহলা- ইবনে বতুতা(১৩৫৮ইং), ইংরেজি অনুবাদ: মাহদি হোসাইন (১৯৭৬ ইং ) পিএইচডি লন্ডন, ডি লিট প্যারিস পৃ. ২৩৮ ।
০২. আইনে আকবরী ভলি: ৩- আবুল ফজল আল্লামী(১৫৯০) ইংরেজি অনুবাদ কর্ণেল এইচ. জে জ্যারেট (১৯৪৮) পৃ. ৩৯৮, ৪০৬ ।
০৩. হযরত শাহজালাল র. দলিল ও ভাষ্য - দেওয়ান নুরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী (ডিসে, ২০০৪) ইসলামিক ফাউন্ডেশন পৃ. ৫৫-১০৯ ।
০৪. শাইখুল মাশাইখ হযরত শাহ্ জালাল মুজাররদ রহ.- এএফএম শহীদুল ইসলাম সেলিম-পৃ.২১-২২, ২২২-২২৭।
#বিশেষ দ্রষ্টব্য: সোহায়েলে ইয়েমেনির উর্দু অনুবাদক মুফতি আজহারউদ্দীন, সাবেক সচিব এ জেড এম শামসুল আলম, সাবেক সচিব সৈয়দ মর্তুজা আলী, সাবেক সচিব ও ঐতিহাসিক এস এম ইকরাম, বহু ভাষাবিদ ড. মোহাম্মদ শহিদুল্লাহসহ উল্লেখযোগ্য স্কলার ও গবেষকগণ বর্তমান প্রচলিত ইয়েমেনি বর্ণনা ভিত্তিহীন ও অপ্রাসঙ্গিক মর্মে মতামত ব্যক্ত করেছেন। এএফএম শহীদুল ইসলাম সেলিম, লেখক ও গবেষক।
প্রকাশক ও সম্পাদক: কামরুল হাসান জুলহাস
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।